সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক পরিচয়ে যাকে আমরা চিনি, তিনি রুমা মোদক। কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার এবং দীর্ঘদিনের থিয়েটারকর্মী হিসেবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব এক স্বতন্ত্র পথ। তাঁর লেখালেখির ভুবন যেমন মানবজীবনের নানা অনুষঙ্গকে ধারণ করে, তেমনি মঞ্চনাটকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে দিয়েছে জীবন ও মানুষের প্রতি এক গভীর পর্যবেক্ষণশক্তি।
কিছুদিন হলো তিনি সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বসবাস শুরু করেছেন। একটি দেশ, একটি পরিচিত আকাশ, বহু বছরের স্মৃতি ও সম্পর্কের পরিসর পেছনে ফেলে নতুন ভূখণ্ডে জীবনযাত্রার এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের বেদনা, নতুন সম্ভাবনার আলো, অনিশ্চয়তার প্রশ্ন এবং অভিযোজনের দীর্ঘ গল্প।
সেই গল্পের কিছু অংশ শুনতেই ফিলাডেলফিয়াপত্রিকার পক্ষ থেকে আমরা উপস্থিত হয়েছিলাম তাঁর নতুন ঠিকানায়। এক আন্তরিক বিকেলে দেশ ছেড়ে আসার অনুভূতি, প্রবাসজীবনের প্রথম দিনগুলোর অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, থিয়েটারের স্মৃতি এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হয় তাঁর সঙ্গে। কথোপকথনের এক পর্যায়ে উঠে আসে মানুষের শেকড়, স্মৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীলতার অবিরাম ভ্রমণের কথাও।
ফিলাডেলফিয়াপত্রিকার পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন কবি ও সম্পাদক আহমদ সায়েম।

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : এবার তো আপনি বেড়াতে আসেননি—এবারের আসা অন্য রকম। আগে একবার এসেছিলেন, কিন্তু এবার আসার অনুভূতিটা নিশ্চয়ই ভিন্ন। এই আসার ভেতরের অনুভূতি—ভয়, দ্বিধা, আশাবাদ কিংবা শূন্যতা—কীভাবে বর্ণনা করবেন?
রুমা মোদক : ভয়, দ্বিধা, আশাবাদ কিংবা শূন্যতা। তোমার প্রশ্ন থেকেই শব্দগুলো নিলাম। ব্যাপারটা প্রত্যাশিতই ছিল। একেবারেই হঠাৎ হয়ে গেল, চলে এলাম তা নয়। তারপরও প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা কিছুটা তো ছিলই। ইমিগ্রান্ট বিষয়টাই তো অনিশ্চিত। দীর্ঘদিন প্রক্রিয়াটি চলমান ছিল। মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু সেই মানসিক প্রস্তুতিতে নিজের কোনো কাজ, দায়িত্ব, সামাজিকতা কিছুতেই হেলা করিনি। অর্থাৎ প্রস্তুতি ছিল পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ জীবনে তার কোনো প্রভাব পড়তে দেইনি। বাচ্চাদের লেখাপড়া, নিজের সাহিত্য ও থিয়েটার, পেশাগত, সাংসারিক ও সামাজিক কোনো ক্ষেত্রেই নয়। সব ষোলোআনা করেছি, নিজের সাধ্য আর সামর্থ্যের সর্বোচ্চ সদব্যবহার করে।
যখন ভিসা পেয়ে গেলাম, তখন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। কোনো পিছুটান সংশয়ে ভোগায়নি।
কিন্তু যখন আক্ষরিক অর্থে সব গোছাতে শুরু করলাম তখন আমাকে ভীষণ ডিপ্রেশনে পেয়ে বসলো। আমি নিজেকে মানাতে পারছিলাম না আমি সব ছেড়ে চলে যাচ্ছি, একেবারে চলে যাচ্ছি। এবং কোথায় যাচ্ছি, সেখানে কেমন থাকব আমি জানি না। একসময় মনে হতে থাকল আমি মধ্যসমুদ্রে ঝাঁপ দিচ্ছি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। এতদিনের চেনা জীবন, এতদিনের অভ্যস্ত যাপন। যত্নে গড়া সংসার এবং জগৎ। ঘরে ঝোলানো রবীন্দ্রনাথের পেইন্টিং, শোপিস, কফির মগ সবকিছুর জন্য আমার এত খারাপ লাগতে লাগলো আমি এই ডিপ্রেশন থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে পারছিলাম না। অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র ভয় ছিল, বাচ্চারা সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ পাবে এই আশাবাদটাই সঙ্গী ছিল। এজন্য দ্বিধাও ছিল না।
আমার দেশ ছেড়ে আসার দুঃখ আছে, কষ্ট আছে কিন্তু আফসোস নেই। এই দুঃখ, কষ্ট তো শূন্যতা থেকেই। একটা জীবন দিয়ে গড়ে তোলা নিজের পরিমণ্ডল ছেড়ে আসা আসলে মৃত্যুরই আরেকটা নাম৷

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : পরিচিত অসংখ্য মুখ, বহুদিনের চেনা পথঘাট, আর নিজের ঘর—সবকিছুকে পেছনে রেখে আসতে হয়েছে। মানুষের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া আর নিজের ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে আসা—এই দুই মুহূর্তের অভিজ্ঞতা কি আলাদা ছিল? সেই বিদায়ের দৃশ্যটা কেমন ছিল?
রুমা মোদক : একদম গভীরে গিয়ে ভাবতেই ভীষণ কষ্ট হয়। ঘর তালা দিয়ে চলে আসা!
আমি চলে আসতে বাধ্য হইনি। ইচ্ছা করে অপশন নিয়েছি। দু সপ্তাহ প্রায়, কিন্তু এখনো মনে হচ্ছে বেড়াতে এসেছি৷ ফিরে যাব, গিয়ে দেখব সব আগের মতোই আছে। আমার লিভিং রুম, আমার রান্নাঘর, আমার কর্মস্থলের চেয়ার…আমি কিছুদিন পরই আবার আমার গতজীবনেই ফিরে যাব।
এই জীবনে অনেকবার ঠিকানা বদল হয়েছে। বাড়ি ছেড়ে হলে গেছি, বিয়ে করে অন্য বাড়ি গেছি, নিজে বাসা ভাড়া করে থেকেছি, চাকরির বদলিজনিত কারণে অন্য শহরে গেছি। কিন্তু এবারের আসাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। আসার আগে যে আতঙ্ক আর হৃৎকম্পন ছিল, আসার পর তা নেই। তার কারণ একটা ঘোরে আছি, নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছি না আমি আর ফিরব না।

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : আপনার ঘরে নিশ্চয়ই অনেক বই ছিল—যেগুলো শুধু বই নয়, সময়েরও সঙ্গী। দু-একটি ছাড়া খুব বেশি বই হয়তো সঙ্গে আনতে পারেননি। বাকি বইগুলোর কী হলো? সেগুলোকে রেখে আসার অনুভূতিটা কেমন ছিল?
রুমা মোদক : আহা আমার বই! বালিকাবেলা থেকে সঞ্চয় করা। এর অধিকাংশ কেনা। অল্প কিছু উপহার। কয়েক হাজার বই। বারবার যখন ঠিকানা বদলাই, সব বই কখনো সাথে নেয়া হয়নি। যখন ঠিকানা পরিবর্তন হয় সবার মাথাব্যথা ছিল আমার বই কী করব। আমি একটা ক্যাটাগরি করে কিছু বই সাথে নিয়ে গেছি৷ এখানে আসার সময় কোনো বই সাথে আনা হয়নি। প্রচণ্ড শীতে শীতের কাপড়ের ওজনটাই বয়ে নিয়ে এলাম।
আলাদা বক্স করে কিছু বই রেখে এসেছি।
স্বজন পরিজনরা সবাই বলছিল, বই সব কোথাও দান করে দিতে। আমি ঘরের অনেককিছু ছেড়ে দিয়ে এসেছি। বিক্রি করেছি, দান করেছি৷ রেখে এসেছি শুধু বইগুলো৷ কখনো সুযোগ পেলে এই অমূল্য সম্পদগুলোই শুধু নিয়ে আসব এই আশায়।
যা ফেলে এসেছি আমার বিগত জীবন, শেকড়, সবই মায়া। আর কোনোই পিছুটান নয়। আমার পিছুটান কেবল এই বইগুলো আর আমার মা।

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : এই দেশে প্রথম আসার পর আমি রাস্তায় নেমেই সবচেয়ে বেশি মিস করেছিলাম ‘রিকশা’ আর ‘সিএনজি’-কে। আপনার ক্ষেত্রে কী এমন কিছু আছে—ছোট কিন্তু আপন—যা এখানে এসে হঠাৎ খুব মনে পড়ে?
রুমা মোদক : মিস করছি। খাবার অভ্যাস। যখন তখন বেরিয়ে পড়ার অভ্যাস। বেকারির বিস্কিট। ইফাতারের জিলাপি, ছোলা…। ঘর থেকে বের হতে গেলেই রিকশা, সি এন জি। সবই মিস করছি। কিন্তু নতুন জীবনের সাথে দ্রুত মানিয়ে নেয়ার মানসিক প্রস্তুতি আমার রয়েছে, তাই অনেক অনভ্যস্ততা, অনেক দুঃখকে তুড়ি মারছি।

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : কয়েক মাস হলো আপনি যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে বসবাস শুরু করেছেন। নতুন দেশ, নতুন শহর ও সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন?
রুমা মোদক : হয়তোবা জীবন ও জগতকে আমি যেভাবে দেখি আরেকজন সেভাবে দেখে না। আমি চেষ্টা করি গভীরে গিয়ে কেবল দেখা নয়, উপলব্ধি করার। ফলে প্রতিটি বিষয় আমার কাছে বহু মাত্রা নিয়ে আসে। এটার ভালো দিকটা হলো কোনোকিছুই হতাশ করতে পারে না আমাকে। হাল ছাড়ি না সহজে।
এই জীবন তো সব দিক থেকেই নতুন। যাপনের অভ্যাস, খাওয়া বা ঘুমের অভ্যাস, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যবধান সবই চ্যালেঞ্জ।
জীবন মানেই অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। এই যে নতুন সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমাকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা নিচ্ছে আমি অভিযোজন করতে পারছি কি না, অকৃতকার্য হলেও আমি হাল ছাড়ছি না।

ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা : একজন কবি, কথাশিল্পী ও থিয়েটারকর্মী হিসেবে এই নতুন পরিবেশের মানুষজন, জীবনযাত্রা, বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা কিংবা শহরের গতি—আপনার সৃজনশীল ভাবনা ও পর্যবেক্ষণে কোনো নতুন মাত্রা যোগ করেছে কি? করলে সে-বিষয়ে কিছু বলবেন?
রুমা মোদক : তা তো করেছেই। প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। সবই কি সুখের? নিশ্চয়ই না। আবার আনন্দেরও কম নয়। সব বলব হয়তো একদিন। এখনও সময় হয়নি বলার।
তবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করছি আমার এই ‘কেউ না’ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। এই প্রবাসে আমরা যে যেখান থেকে অভিবাসী হয়ে আসি ‘কেউ না’ হয়েই আসি। কিন্তু এখানে বসবাসরত প্রতিটি ক্ষেত্রের মানুষ নানাভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিতে চায় আমি ‘কেউ না’।
প্রবাসী জীবন তো আমার নির্বাচন, কেউ বাধ্য করেনি। তাই অভিযোগ যদি কারো প্রতি তুলতে হয় তবে আঙুলটা নিজের দিকেই প্রথম তুলব।
আহমদ সায়েম প্রণীত অন্যান্য রচনা
কবি ও গদ্যকার



