কবিতা সাহিত্য

সমুদ্র কখনো বলে না || মেকদাদ মেঘ

শেয়ার করুন:

‎অন্তরাত্মার স্রোতে সমুদ্র কখনো বলে না—
কত লবণ জমে আছে বুকের গোপন মানচিত্রে;
ঢেউ শুধু শিখে নেয় ভাঙনের ব্যাকরণ,
ফেনা লিখে যায় ক্ষণিক শ্বেত-লিপি বালুকাক্ষেত্রে।
সমুদ্র কখনো বলে না—কোন ডুবুরির চোখে নীলের প্রথম বিস্ময়;
শঙ্খের অন্তরে লুকিয়ে রাখে আদিম ধ্বনি,
জোয়ারের কপালে আঁকে চাঁদের নীরব পরিচয়।

মহাশূন্যের বাতায়নে সমুদ্র কখনো বলে না—
কত মৃত নক্ষত্র ভেসে আসে জলের স্বপ্নে;
প্রবালের শহরে ঘুমিয়ে থাকে সময়, মাছ
ইতিহাস লেখে অদৃশ্য বর্ণমালার যন্ত্রে!

নিস্তব্ধতার কথাও সমুদ্র কখনো বলে না—
কোন দ্বীপ একদিন ছিল মানুষের হৃদয়;
মানচিত্র বদলায়, বাতাস বদলায়, রূপ রস রঙ
তুমুল ঝড়ের মতো কত কী বদলায়
তবু লবণের ভেতর বেঁচে থাকে অনন্ত পরিচয়।
সমুদ্র কখনো বলে না—কেন দিগন্ত প্রতিদিন সরে যায় দূরে;
যে তাকে ছুঁতে চায়, সে-ই জানে—

অসীম কেবল নিজের ভাঙা আয়নায় ঘুরে।
সমুদ্র কখনো বলে না—কত কান্না মিশে আছে বৃষ্টির প্রত্যাবর্তনে;
মেঘ ধার নেয় নীলের নিঃশ্বাস,

আবার ফিরিয়ে দেয় জলের জন্মক্ষণে।
সমুদ্র কখনো বলে না—নীরবতাই তার গভীরতম ভাষা;
আমরা শুধু তীরে দাঁড়িয়ে শুনি,

নিজেদেরই প্রতিধ্বনি ভেবে ঢেউয়ের প্রত্যাশা।
সমুদ্র কখনো বলে না—নিভৃত বিষাদের কথা
তবু তার অগণন নীরব উচ্চারণে মানুষ শেখে—
যা সবচেয়ে গভীর, তা কখনো শব্দে নয়,
জেগে থাকে অনন্ত জলরেখার অকথিত কবিতা হয়ে।

লবণের অভিধান থেকে গান লিখে দিতে পারি
সমুদ্র কখনো বলে না—কোন বর্ণমালার
জন্ম হয়েছিল প্রথম ঢেউয়ের জিভে, তাও বলে না।
একটি মৃত জাহাজ এখনও তার পাঁজরে বহন করে
অব্যবহৃত কয়েকটি ক্রিয়াপদ। যেন মাছের চোখে
নিজের পাসপোর্ট দেখি—
দেখি সেখানে রাষ্ট্রের বদলে লেখা আছে :
‘জলই একমাত্র নাগরিকত্ব।’
চাঁদ রাতে তার ভাঙা দাঁত ফেলে যায় জোয়ারের ভেতর,
সকাল ভেজা সংবাদপত্রের মতো

উপকূলে এসে পড়ে।

সমুদ্র কখনো বলে না  ফেনার গণতন্ত্রের কথা
ফেনাগুলো ভোট দেয় বাতাসকে,
ঢেউগুলো বিরোধী দল হয়ে
পাথরের সংসদে অনাস্থা আনে।
একটি কাঁকড়া বালুর নিচে সংবিধান লুকিয়ে রাখে।
সমুদ্র হাসে না, কাঁদেও না—
সে শুধু নীল রঙের ভেতর
একটি অবৈধ সীমান্ত এঁকে রাখে।
মানুষ তাকে বলে উপকূল।

সমুদ্র বলে না একটি ডুবে যাওয়া আয়নার কথা
যেন অজস্র সময় সমুদ্রের ভেতর
একটি আয়না ডুবে গেছে অজস্র আয়না হয়ে।
সেই আয়নায় মাছও মানুষ হয়ে ওঠে!
মানুষও শামুকের খোলসে ভাড়া থাকে!
আমার মুখও যেন অক্টোপাসের বাহুতে ঝুলছে।
সমুদ্র কখনো বলে না—কার মুখই বা আসল!

নীলের শরীরতত্ত্ব যেন সমুদ্রের মতো
নীল কোনো রং নয় যেন একটি দীর্ঘ অসুখ,
যেখানে আকাশ সমুদ্রের প্রেসক্রিপশন পড়ে না।
তিমি স্বপ্নের এক্স-রে রিপোর্ট বহন করে,
ডলফিন হাসির ভেতর সেলাই করে দেয়
মৃত নাবিকদের শ্বাস।
একটি প্রবালের কাছে শুনেছি—সময় আসলে
একটি ডুবে যাওয়া কম্পাস,
সমুদ্র সে-কথা আমাকে বলেনি।

শেষ উপকূল থেকে সমুদ্র কী কিছু বলে?
যেন পৃথিবীর শেষ উপকূলে
একটি শিশু বালু দিয়ে বানাচ্ছিল নতুন মহাদেশ।
ঢেউ এসে সেটিকে মুছে দিলো না—
বরং নিজের শরীরে তুলে নিলো।
সেই থেকে মানচিত্রে
অদৃশ্য একটি দেশের নাম লেখা আছে ‘অকথিত’।
সমুদ্র কখনো বলে না সে-ই সেই দেশের রাজা।

সমুদ্রের নীরবতা অন্তিম রহস্যের মতো
যখন সব শব্দ নিজেদের কবর খুঁড়তে ব্যস্ত,
তখন সমুদ্র যেন একটি নীরব পিয়ানো বাজায়।
প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি ফেনা অব্যক্ত সুরের ভগ্নাংশ।
আমরা তীরে দাঁড়িয়ে শুধু করতালি দিই।
সুরটি আমাদের কারও একান্ত নয়।

সমুদ্র কখনো বলে না কিছু তবু কী যেন বলে
সমুদ্র কখনো বলে না—
তার বুকে কতগুলো অসমাপ্ত সৃষ্টির অধ্যায়
শৈবালের মতো জন্ম নিয়েছে।
কতগুলো সভ্যতা এখনও লবণের নিচে
ধুয়ে চলেছে নিজেদের ভাষা।
কত মানুষ নিজেদের মুখ হারিয়ে
ঢেউয়ের মুখ ধার করে বেঁচে আছে।
সে শুধু দিগন্তের দিকে
একটি অন্তহীন নীল বাক্য লিখে যায়।
আমরা তাকে পড়তে পারি না।
তবু প্রতিদিন তার অনুবাদ হয়ে
আমাদের চোখের ভেতর জল জমে।

সমুদ্র কখনো বলে না—তার বুকে কতখানি নীল চেপে রাখা আছে, কতটুকু নোনাজল মেঘ সেজে উড়ে গেছে আকাশের কাছে। সে শুধু চিত্রার্পিতের মতো মেলে রাখে বিশাল আরশিনগর, যেখানে ঢেউয়েরা এক-একটি রুপোলি ডানার চিল, ছুঁয়ে যায় তীরের বালুকা, যেন আদিম কোনো প্রেমিকের ঘর।বিশালতা চুপিচুপি সয়ে যায় সহস্র ঝড়ের আঁচড়,যেন কোনো মরমী কবি গোপনে বুনে চলে তার দুঃখের ভাস্কর।

জলছবির গভীরতা নিয়ে সমুদ্র কখনো বলে না—আমি তৃষ্ণার্ত, আমাকে একটু মেঘ দাও, কিংবা তীরের নোঙর ছিঁড়ে আমার অতলতায় হারিয়ে যাও, সে কথাও বলে না। সে তো এক মৌন খনি, যার তরঙ্গে ভাসে চাঁদের চিরন্তন তিলক,নিশাচর জাহাজের আলো যেন তার গায় চন্দনের ফোঁটা ।জলরাশি যেন কুমারী নারীর রেশমি আঁচল, যা বিছানো রয়েছে দিগন্ত জুড়ে, শান্ত এবং ব্যাকুল।বুকের ভেতর সে লুকিয়ে রাখে কত ডুবোজাহাজের কঙ্কাল,তবুও বাইরে সেজে থাকে স্নিগ্ধ, যেন  নীল পদ্মের চাদর।

তীরের সংলাপ সমুদ্র কখনো বলে না—বলে না তীর, আমি তোমার দাসত্বে বাঁধা, ভাঙনের খেলায় লুকিয়ে আছে কোনো জটিল ধাঁধা। তার ফেনাগুলো যেন শ্বেতশুভ্র কাশফুলের একেকটি নদী, যা আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয় বালুর নির্জন উঠোনে। যেন চিরন্তন যাযাবর, স্তব্ধতায় যেন কোনো হিমালয়, তার গর্জন আসলে শতাব্দীর ঘুমন্ত সেই  হাহাকার। সে নীরবতার ভাষায় লেখে মহাকাব্যেরই অনুচ্ছেদ, যেখানে ঢেউ কেবলই চুমু খেয়ে যায় তীরের বর্ণিল কপালে।

মেকদাদ মেঘ প্রণীত অন্যান্য

মেকদাদ মেঘ। কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক ও পত্রিকাসম্পাদক

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *