—আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের দুই দিন পরই ফিলাডেলফিয়ার মসজিদে কে বা কারা অগ্নিসংযোগের মতো ন্যাক্কারজনক কাজ করেছে।
—‘একটি মসজিদে হামলা মানে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হামলা’—ঘৃণার বিরুদ্ধে এক মঞ্চে কংগ্রেসম্যান, সিনেটর, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতারা।
—টাইসন মসজিদে ইন্টারফেইথ সমাবেশ; ঘটনাকে সম্ভাব্য ‘হেট ক্রাইম’ হিসেবে তদন্ত, তথ্যদাতার জন্য ১০ হাজার ডলার পুরস্কার।
যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের আদর্শে গর্ব করে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের মাত্র দুই দিনের মাথায় ফিলাডেলফিয়ার অন্যতম বৃহৎ মুসলিম উপাসনালয় নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার (টাইসন মসজিদ)-এ পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশটির ধর্মীয় সহনশীলতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পরপরই ফেডারেল ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত শুরু করেছে। অগ্নিসংযোগটি ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হেট ক্রাইম কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অভিযুক্তকে শনাক্তে ১০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ প্রাঙ্গণ পরিণত হয় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংহতির এক বিরল মঞ্চে। একই সারিতে দাঁড়ান যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য, অঙ্গরাজ্যের সিনেটর, সিটি কাউন্সিল সদস্য, শেরিফ, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি এবং মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মীয় নেতারা। তাঁদের অভিন্ন বার্তা—ঘৃণা নয়, ঐক্যই আমেরিকার পরিচয়।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার রাত প্রায় ২টার দিকে মুখোশধারী এক ব্যক্তি আগুন জ্বালানো একটি ব্যাগ মসজিদের প্রধান প্রবেশপথে নিক্ষেপ করে দ্রুত পালিয়ে যায়। সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনা ধারণ হয়। পাশ দিয়ে যাওয়া এক নারী খাদ্য সরবরাহকারী আগুন দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ৯১১-এ ফোন করলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আর কয়েক মিনিট দেরি হলে পুরো ভবন আগুনে ভস্মীভূত হতে পারত।
ফিলাডেলফিয়া সিটি কমিশনার্স বোর্ডের চেয়ারম্যান ওমর সাবির বলেন, “মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি একটি কমিউনিটির প্রাণকেন্দ্র। এখানে মানুষ বিয়ে করে, জানাজা হয়, শিশুরা শিক্ষা গ্রহণ করে। একটি মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা মানে প্রতিটি গির্জা, সিনাগগ ও উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা।”
তিনি ব্যক্তিগতভাবে ২,৫০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেন। এর আগে ATF ৫ হাজার ডলার এবং CAIR-Philadelphia ২ হাজার ৫০০ ডলার ঘোষণা করায় মোট পুরস্কারের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টারের সভাপতি মাসুখুল ইসলাম খান বলেন, “আল্লাহর রহমতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু এই মসজিদ আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। এখানে শত শত পরিবার ইবাদত করে, শিশু-কিশোররা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে। এই হামলা শুধু একটি ভবনের ওপর নয়, আমাদের বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ ও সম্প্রীতির ওপর আঘাত। তবে ঘৃণা আমাদের পরাজিত করতে পারবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ফিলাডেলফিয়া সিটি কাউন্সিল অ্যাট-লার্জ সদস্য ড. নীনা আহমেদ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং কোনো সম্প্রদায়কে একা ফেলে রাখা যাবে না।

ফিলাডেলফিয়ার মেয়রের মুসলিম এনগেজমেন্ট বিষয়ক পরিচালক ইমাম কুয়াসিয়ার আবদুল্লাহ বলেন, “মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে আমরা ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলেছি। আজ একটি উপাসনালয়ে হামলার জবাব দিতে আমরা একত্র হয়েছি। ধর্মীয় স্বাধীনতাকে ভয় দেখিয়ে কখনো স্তব্ধ করা যাবে না।”
পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর শরীফ স্ট্রিট বলেন, “এটি শুধু অগ্নিসংযোগ নয়; এটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকারকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। যদি এটি হেট ক্রাইম প্রমাণিত হয়, তাহলে এর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যান ব্রেন্ডান বয়েল বলেন, “উপাসনালয় শান্তি, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের প্রতীক। সেগুলো কখনো ঘৃণা ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। যার কাছে তথ্য রয়েছে, তিনি যেন দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান। মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আছি।”
CAIR Pennsylvania-র নির্বাহী পরিচালক আহমেত সালাম তেকেলিওগ্লু যিনি এই আয়োজনটির মুল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করেন প্রেস কনফারেন্সে আসার জন্য।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন সিনেটর ক্রিস্টিনা টার্টাগ্লিওনি, সিনেটর ভিনসেন্ট হিউজ, স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যান্থনি বেলমন, সিটি কাউন্সিল সদস্য অ্যান্থনি ফিলিপস, কার্টিস জোনস জুনিয়র, নিকোলাস ও’রুর্ক, শেরিফ রোশেল বিলাল, সিটি কাউন্সিল সদস্য ক্যাথরিন গিলমোর রিচার্ডসন, রেজিস্টার অব উইলস জন পি. সাবাটিনা, CAIR Pennsylvania-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেত সালাম তেকেলিওগ্লু, NAACP Philadelphia Branch-এর সভাপতি ক্যাথরিন হিকস, Philadelphia Commission on Human Relations-এর প্রতিনিধি রেনি শেনল্ট-ফাত্তাহ, বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, গির্জার পাদ্রি, সিনাগগের রাব্বি এবং অসংখ্য কমিউনিটি নেতা।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ঘৃণা ও সহিংসতার রাজনীতিকে প্রতিহত করতে ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কারণ, একটি উপাসনালয়ে হামলা কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়; এটি আমেরিকার সাংবিধানিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণে অনুদান সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তদন্ত অব্যাহত থাকলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা করে অভিযুক্তকে শনাক্তে কাজ করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
ডেস্ক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা



