সময় মিলিয়ে দেখি : কাল যখন আরব ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায় বইটি পড়ছিলাম তখন তাঁর লেখক অহুদের যুদ্ধ নয়, না কারবালার লড়াই— নিরঙ্কুশ জীবনযুদ্ধে বাতাসের হিস্যা নিয়ে লড়ছিলেন। এতোক্ষণে হাওয়ার জিৎ হয়েছে; তিনি ঘাড় কাত করে মহাজীবনকে কুর্নিশ করেছেন!
তিনি— মুহম্মদ বাকের— মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন; কিন্তু মৃত্যু পরাজিত হয়েছে আমাদের স্মৃতির বুন্দিয়া বাত্তির কাছে! আমরা সবাই যাকে চিনি সরিষাপুরের পিন্টু মিয়া বলে।
মৃত্যুর থোরাই সাধ্য আছে সরিষাপুর বুড ইশকুলে ঘন রাত্রির বুকে টিপটিপ করে জ্বলতে থাকা হারিকেনের আলোয় নিমজ্জমান মুহম্মদ বাকের—এর রচনা ও নির্দেশনায় মহাবিদ্রোহ, পিতৃঘাতী পাষণ্ড, ভগ্নসত্ত্বা, কিংবা পলাশীর কান্নার মহড়ায় মোহাম্মদ হাসানউদ্দীন, নরেশ কাহু, কী গোলাম নূরুদ্দীনের দোর্দণ্ড প্রতাপ কণ্ঠস্বর মুছে দেয়!
আমাদের বালকবেলায় ঈদ,পুজা পার্বণ কিংবা অন্য কোন উষ্টমে বাকের পিন্টু দাদা বাড়ি এলে আমাদের মনে হতো এই মহল্লায় এক যাদুকর রাজকুমার এসে নামে! আমাদের কখনও মনে আসেনি— তিনি বড় এক সরকারি কর্মকর্তা।
তিনি না বললে ওই বয়সে কে আর বলবে সুদূর ইটালিতে লুইজি পিরানদেল্লো বলে এক নাট্যরচয়িতা আছেন— দারুণ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর পড়ে দেখো, ওই উঁচু পাহাড়টিই শেষ কথা নয়— তার ওপারেও আছে প্রস্রবণের ধারায় বহমান লোকালয়, একটু বড় হয়েই পড়ে ফেলো জাঁ পল সার্ত্রে, আমাদেরও আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; হাসান আজিজুল হক পড়তে হবে চটজলদি বোঝার জন্যে কীভাবে জীবন ঘষে আগুন জ্বলে— বুঝবে সমাজ কীযে এক হাড়হাড্ডি শ্রেণী সংগ্রামের ফল! বাঙলা নাটকের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে যাত্রা পালার ভিতর— একবার খোঁজ করলেই নড়েচড়ে উঠবে। যাত্রাভিনয়ের ঢঙটি আয়ত্ত করতে পেরেছেন বলেই উৎপল দত্ত সেরা বাঙালি অভিনেতা।
নানা ঘাটে ভিড়িয়ে ডিঙ্গা পান খেতে খেতেই একজীবন হঠাৎ কোনদিক দিয়ে আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে যায়; মেলার, হাটের কোনদিকে কোন সওদা— তা হিসাবের খাতায় আনতে আনতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে,আহা!
১৯৭১,নিমপাতা, কুমড়া ফুল, বতুয়ার শাক, বোয়াল মাছ, মধু ও মৌমাছি, জায়নামাজ, পাক্কা বাড়ি, প্রিন্টের জামা, জামদানি শাড়ি, আম্মাসিফারা, মারসিডিজ বেঞ্জ— কোনটা, কোনটা আমাদের আসল সওদা? আমরা সবাই খোঁজ করি— মুহম্মদ বাকেরও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার তালাশ করে গ্যাছেন : আমরা তাঁর লেখালেখির ইতিবৃত্তটি টানলেই বুঝতে পারবো।
নাটক: ভগ্ন সত্ত্বা, পলাশীর কান্না, যখন ফুলে বন্যা এলো, ফিরোজা বেগমের দিনগুলো, কুসুম রং, চম্পাতলির মেইল ট্রেন, সরল বৃক্ষের কথা, অরণ্য, ক্ষুধিত পাষাণ এবং, হেমলক কিংবা গরুর দুধ, চন্দ্রধরের পালা, উত্তাল পদ্মায় হরিপদ কেরাণী, কুয়াতে বাহার হালুয়া, তমা আমার তমা, চিতা বাঘের কথা।
কিশোর নাটক: মিথ্যা বলার অনেক জ্বালা, খোকনের চন্দ্র যাত্রা, দর্জিপাড়ার নতুনদা।
ইতিহাস: বাজিতপুরের কথা, মুক্তিযুদ্ধে বাজিতপুর, আরব ইতিহাসের মর্মান্তিক অধ্যায়, টাঙ্গাইল জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, গ্লিমসেস অব কক্সবাজার, লৌহিত্যে প্রতিরোধ।
নাট্যপত্র মুহম্মদ বাকের সংখ্যা বের করার সময় দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেবার বেলায় আজো মনে পড়ে— জিজ্ঞেস করেছিলাম: আপনি কর্মময়, সৃষ্টিশীল, বর্ণাঢ্য এক জীবন পেয়েছেন, আপনার অতৃপ্তি কী— তিনি বলেছিলেন, জীবন কখনই দীর্ঘ নয়, সবসময়ই ছোট! তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসটি পড়ে দেখো, তার শেষ লাইনটিই আমার সবচেয়ে প্রিয়: মা,জীবন এতো ছোট ক্যানে!

বদরুজ্জামান আলমগীর। কবি ও নাট্যকার



