বিনোদন

প্রেম, পাপ কিংবা নিয়তির হাওয়ায় একফোঁটা রইদ ।। রাশা নোয়েল

শেয়ার করুন:

মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ যখন দেখি, সিনেমাটা শেষ করে মনে হয়েছিলো—হাওয়ার বৈশিষ্ট্যই এমন, প্রথমে গায়ে লাগে, এরপর শূণ্যতা তৈরি হয়। এবং একইসাথে এও বলেছিলাম—এই সিনেমা আমি দ্বিতীয়বার হলে গিয়ে দেখবো না। এই সিনেমা উপভোগ করতে হবে প্রথমবারে, এবং সেই উপভোগ আমি করেছিলামও। একইসাথে এও বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম—যদি পরিচালক রিমেক করে আরো দুইঘণ্টা যুক্ত করে, কেবল এবং কেবল তখনই আমি দ্বিতীয়বার দেখতে রাজি।

পরিচালকের প্রথম সিনেমা হিসেবে হাওয়া  সম্পর্কে এমন অভিমত আমি বেশ মুগ্ধ হয়ে দিয়েছিলাম, এবং এখনও এই মতামতের ব্যাপারে আমার সেইম পজিশন। ‘রইদ’ প্রসঙ্গে হাওয়ার আলাপ একটু নেসেসারি ছিলো, তাই (এবং কেন প্রাসঙ্গিক) একটু বলে রাখলাম। রইদে ফিরি।

একটা নোট দিয়ে রাখা জরুরি : এই লেখায় স্পয়লার থাকবে কি না আমি এখনও জানি না, তবে স্পয়লার জেনে গেলেও সিনেমার জৌলুশে কোনো ভাটা পড়বে না। দ্যাটস গ্যারান্টিড।

সিনেমার নাম রইদ  কেন, সিনেমার নাম হাওয়া  কেন—এসবের ভেতর কোনো কানেকশন আছে কি না সেটা যাচাই করতে গিয়ে হুট করে ধারণা হলো এগুলোর সাথে প্রকৃতির একদম মৌলিক ব্যাপারগুলো কোনোভাবে জড়িত কি না। মানে অফ কোর্স সুমনের দুটো সিনেমাই প্রকৃতির কোনো-না-কোনো হ্যাপেনিংয়ের মধ্য দিয়ে ঘটছে। আর এর বাইরে আমরা যদি এমনিও বইপত্রের দিকে তাকাই, প্রকৃতির পাঁচটি প্রধান উপাদান বা ‘পঞ্চভূত’ হলো পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু এবং শূন্য (বা আকাশ)। এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রাচীন ভারতীয় দর্শন, আয়ুর্বেদ এবং বাস্তুশাস্ত্রের ভিত্তি। এসবের মধ্য দিয়েও কিন্তু সিনেমার একটা অ্যাঙ্গেল বের করা যায়, শেষমেশ এই উপসংহারেও আসা যায় যে মেজবাউর রহমান সুমনের নেক্সট সিনেমা বাকি তিনটার যে-কোনো একটা ইলিমেন্টের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হতে যাচ্ছে।

চাইনিজ টাওইজমে ফেং শুই নামে একটা ব্যাপার আছে, সেখানেও সেম ৫টা ইলিমেন্টের কথা আছে। এই ফেং শুই ঘটনাটা ‘কপাল’ বা ভাগ্যকে ডিফাইন করে। অর্থাৎ এটা একটা সিস্টেম/চিন্তাপ্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ভাবা হয়ে থাকে কীভাবে ৫টা ইলিমেন্ট প্রকৃতি, জড়-জীব বস্তু এবং মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। অনেকক্ষেত্রে ‘কপাল/ভাগ্য’ ব্যাপারটা মিসলিডিং হতে পারে, তাই বলে রাখা ভালো—ফেং শুই ভাবনায় লাক কোনো র‍্যান্ডম ব্যাপার না, বরং একটা অর্গানাইজড/ব্যবস্থা যার মাধ্যমে আশপাশের এনার্জি/ম্যাটেরিয়াল কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য বেটার সিচুয়েশন ক্রিয়েট করা যায়। যা-ই হোক, এগুলো জানা অতি জরুরি না, সুমনের অতি‘প্রকৃতিক’ সিনেমা প্রসঙ্গে একটু আইডিয়া দেওয়া আমরা কিসের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি।

রইদে অনেক কিছু আছে, যা আপনারা অলরেডি ধারণা করতে পেরে ফেলেছেন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ মানুষী, তাদের ভেতরের সিন, অনুতাপ, কামনা, প্রতিশোধ ইত্যাদি সবই আছে। ব্রিলিয়ান্সিটা এই জায়গায়—এগুলোর কোনোকিছুই ওভারল্যাপ হয়ে যায়নি। কোনো পর্যায়ে এসে মনে হয়নি আননেসেসারি দৃশ্য, ইন্টারেকশন ইত্যাদি। সিনেমার এমন কোনো ফ্রেম আমি পাই নাই মুভমেন্ট ছাড়া। হয় দৃশ্যে মুভমেন্ট, নয়ত আপনার হার্টে। ঢিপঢিপ। ঢিপঢিপ।

রইদ ও চরিত্রের কনশাসনেস
সাদুর গল্প—যে-গল্পে সাদুর বউ পাগল। পুরো সিনেমায় আমরা সাদুর বউয়ের নাম জানতে পারি না। সাদু নিজেও তার বউয়ের নাম জানে না। পরিচয়হীনতা আমাদের ধাক্কা দেয় সিনেমার মাঝামাঝি এসে। প্রশ্ন তোলায়—বউয়ের নাম না জানা সাদু শুরু থেকেই ঠিক কোন মোহের বশবর্তী হয়ে ছিলেন? সিনেমার বিভিন্ন পর্যায়েই সাদুর চরিত্রে সেই পরিচয়সংকট ধরা পড়ে। সে নিজেও মাঝেমধ্যে এমন এমন কাজ করে বসে যেগুলো মেক সেন্স করতে চায় না। সাদুর পাগল বউ যখন ভরা মঞ্চে নেচে ওঠে, অথবা মারামারিতে লিপ্ত হয়—তখন আমার মনে হয় এই আনন্দ, অথবা এই বিবাদে লিপ্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সাদু মূলত নিজের পরিচয়সংকটের উত্তর খুঁজতে চাচ্ছে। আর এই পরিচয়পর্বের মীমাংসা ঘটানোর জন্যই তালের সংযোজন। কীভাবে—এখনও জানি না, আমি উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করতে পারি এই লেখায়।

এশিয়া সাউথ-এশিয়ার বেশকিছু জায়গায় তাল এবং তাল রিলেটেড বিভিন্ন রিচুয়ালের আলাপ আছে। এটাকে গন্দম হিসেবেও ইন্টারপ্রেট করা যেতে পারে, ইন ফ্যাক্ট—এটাই সম্ভব অ্যাকিউরেট পার্সপেক্টিভ, হাউএভার—আমি একই রাস্তায় একটু ভিন্নভাবে ঢুকতে চাইছি।

তামিল কালচারে তালকে স্বর্গীয় বৃক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, শুধু তামিলেই নয়—অন্য আরো জায়গায় একটু রিলিজিয়াস ঘ্রাণসমেত তালকে বলা হচ্ছে কাটপাহা থারু—অর্থাৎ যে-ফলের সকল অংশের কোনো না কোনো ব্যবহার আছেই। সেই ব্যবহারের জায়গা থেকে তালকে হিন্দু এবং আশপাশ অঞ্চলের মিথোলজির সেই সত্তা হিসেবে ভাবা হয় যে কিনা ফিমেল, এবং ফার্টাইল কোয়ালিটি আছে। সংস্কৃতে এই সত্তাকে ডাকা হয়েছে তালাভাসিনি নামে, যার অর্থ—শি হু রিসাইডস ইন দ্য (তাল) বৃক্ষ। বিশ্বাস করা হয় যে তিনি (তালাভাসিনি) গাছের মধ্যে বাস করেন এবং প্রচুর ফলমূল, পানি ও কৃষিকাজে সাফল্য নিশ্চিত করে তার আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।

এই অ্যাঙ্গেল থেকে আমার সাদুর এবং সাদুর পাগল বউয়ের পরিচয়হীনতার পার্সোনাল ডাউট ক্লিয়ার হলো। ব্রিলিয়ান্সিটা আবারও চোখে পড়ল যখন পুরো সিনেমায় একবারই সাদুর পাগল বউ সাদুকে সাদু না বলে পুরোপুরি স্পষ্ট উচ্চারণে ‘সাধু’ নামে ডাকে—এটা এক্সাক্টলি কোন জায়গায় ঘটে (এবং কেন ঘটেছে)—সিনেমাটি যারা দেখে ফেলেছেন ইতোমধ্যে, তাদের কাছে উত্তর হিসেবে উপস্থাপন করে রাখলাম। মোদ্দাকথা এই : সাদুর পাগল বউ কিন্তু একেবারেই নিজ-সম্পর্কে পরিচয়হীন ছিলেন না কখনই, বরং শি ইজ এক্সট্রাঅর্ডিনারিলি অ্যাওয়ার অ্যাবাউট হার সারাউন্ডিংস।

সিনেমায় অবশ্যই আরো অনেককিছু আছে। একটা পিওর আর্টের ধর্মই এমন—অনেকভাবে ইন্টারপ্রেট করা যায়। তালকে একভাবে ধরে, চরিত্রের মানসপটে ঢুকে গিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করে—আবার স্রেফ পশুর প্রকৃতির আচরণ আন্দাজ করেও সিনেমার বিভিন্নরকম অর্থ করা ও বোঝা সম্ভব। দুজন মানুষ মানুষীর খাওয়ার সময় সামনে বসে থাকা বেড়াল থেকে শুরু করে সাদুর বউয়ের গর্ভে কুন্ডুলি পাকিয়ে ঢুকে গিয়ে সাদুর নিজেকে আবৃত করে রাখার সময় বউয়ের গায়ে উঠে যাওয়া ছোটো ছোটো প্রাণি—সব মিলিয়ে ফার্টিলিটির এহেন চিত্র সিনেমার শুরু থেকে শেষপর্যন্ত আপনার চিন্তাকে বাজেয়াপ্ত করবেই।

রইদের গিল্ট ট্রিপ
সাদু আর ঝামেলা পোহাতে চায় না। সে পাগল বউকে রেখে আসে বহুদূরে—যেখান থেকে স্বল্প মেমোরির পাগল বউটির আর ফিরে আসার কথা না। সাদু নৌকা বেয়ে বউয়ের সকল চিৎকার অগ্রাহ্য করে নির্লিপ্ত মুখে ফিরে আসে। পাগল বউয়ের এমবেরাসমেন্ট থেকে বাঁচার জন্য নয়, মূলত নামপরিচয়হীন কোনো বিয়িং-এর সাথে পর্যাপ্ত কানেকশন না ঘটার ফলে সাদুর ভেতরের ডিটাচমেন্ট প্রকট হয়ে ওঠে। এই পুরো ব্যাপারটা সিনেমার বহু পরে “মন ছাড়া কি” গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় দারুণভাবে। আমার মন সামহাউ মানতে নারাজ সাদুর পাগল বউয়ের পরবর্তী অ্যারাইভালের রিজন কেবল তার মনস্তাত্ত্বিক আলোড়নের কারণেই নয়—বরং এই যে আমি কানেকশন অথবা পরিচয়হীনতার প্রসঙ্গ আনলাম, এটার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আমি যেটা বলতে চাইছি তা হচ্ছে—সাদুর বউ যদি ছাগলের নাম কুলসুম না দিয়ে স্রেফ ছাগল হিসেবেই চিন্তা করতো, অর্থাৎ প্রাণ টু প্রাণ একটা কানেকশন না ঘটাতো, তাহলে কী সে সাদুর অ্যাবান্ডনমেন্ট ছিন্ন করে ফিরে আসতো? প্রথমবার রেখে আসার পরে সাদুর বউ কিন্তু বাড়ি ফিরে সবার আগে কুলসুম নাম্নী প্রাণের কাছেই ফিরে গেছে এবং ফিরে গেছে নতুন সংসার করার সমস্ত ইলিমেন্ট নিয়ে বসে থাকা ট্রাঙ্কের কাছে। সাদুর হতচকিত প্রশ্নাতুর চাহনির কোনো মূল্য নেই এখানে। তাল গাছ থেকে পড়া এবং সাদুর বউয়ের ফিরে আসা—এই দুটোর কানেকশনের কেন্দ্রে নারীত্ব, ফার্টিলিটি, প্রাণ-প্রাচুর্য্যে ভরে দেওয়ার আশিস/প্রমিজ—এগুলোই প্রায়োরিটি।

রইদে যখনই সাদু কোনো-না-কোনো অপরাধসূচক কাজ করে, ঠিক তখন তখনই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে পাগল বউ অবতীর্ণ হয়। এমনি অলরেডি তাল স্বর্গীয় বৃক্ষের রেফারেন্স হওয়ার কারণে এটা উইশ-ফুলফিলিং-ট্রি হিসেবে অ্যাক্ট করে, বিভিন্ন কালচারে যা জানা যায়, ফলে—সাদুর গিল্ট ট্রিপের উপশম হিসেবে পাগল বউয়ের প্রতিবার ফিরে আসা একটা অন্যতম ইন্টারপ্রিটেশন হতে পারে। সাদু মূলত নিজেকেই বারবার বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন ভ্রমের মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করছে। একই চক্রের বিভিন্ন লেভেল সাদুর অবস্থান। ‘তাল’ এখানে একটা রিসেট বাটনের মতো। সাদুর জীবনকে একটা সার্টেইন লুপের ভেতর থেকে বের করে আনা। ভয়াবহ মোহাবিষ্ট সাদু তার লুপের অস্তিত্ব নিয়ে সচেতন, সে কোনোভাবেই এই শৃঙ্খল থেকে নিজেকে বের করতে পারছিলো না, শেষপর্যন্ত পারেওনি। এই প্রসঙ্গে আমার বারবার মনে পড়ে যায় গ্যারি কাসপারভের একটা উক্তি—ইফ ইউ কান্ট ডিফিট দেম, জয়েন দেম।

রইদের সিনেমাটোগ্রাফি, সিন সিনারি কেমন এইসব আলাপে আর না যাই। চরিত্রগুলোর চেহারা এমনই—এই সিনেমা নিজ থেকেই ভালো সিনেমাটোগ্রাফি ডিমান্ড করে। তবে মিউজিক নিয়ে প্রশংসা করার মতো এনাফ স্পেস আছে। এক সিন থেকে অন্য সিনের জাম্প—চরিত্ররা মুভ যখন করছে না তখনও, মিউজিক এমন একটা এক্সপিরিয়ান্স দেবে আপনাকে, একটা প্রোপার সিনেমার মতো পুরোটা সময় মিউজিক আপনাকে একোম্পানি করবে।

ঢাকা পোস্টকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে সাদু চরিত্র পালন করা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান বলেছেন একটা দারুণ কথা : “মন দিয়ে দেখো, মন দিয়ে শোনো, মন দিয়ে বোঝো। এই ছবি হলে বসে পাশে লোকের সঙ্গে গপ্প করতে করতে দেখলে হবে না। পপকর্ন খেতে খেতে দেখলে হবে না; পপকর্ন খাওয়ার একটা শব্দ হয়, সেটা ছবির শব্দেও প্রভাব ফেলে। একটা চলচ্চিত্র তো শুধু দৃশ্যে নয়, শব্দ, সংগীত, পারফরমেন্স অনেক কিছু মিলে হয়। আর সবকিছুকে শুধু একটা গল্পের স্ট্রাকচারেই বাঁধতে হবে, তা তো নয়; অনুভূতির স্ট্রাকচারেও বাঁধতে হয়।”

‘রইদ’ সেই ছবি, যেটা অনুভূতির স্ট্রাকচারে বাঁধা, আবেগ ও ঘোরের স্ট্রাকচারে বাঁধা। এখানে মিউজিক কাজ করেছে সুপার গ্লু-র মতো।

 

চরিত্রের অন্যান্যরা!
রইদে চরিত্রের সংখ্যা অগুনতি। প্রতিটা ফ্রেমের প্রতিটা বস্তু এক একজন চরিত্র। সিনেমাটা যখন দেখবেন, বুঝতে পারবেন আমি একটু অত্যুক্তি করছি না। ফ্রেমে মনে হবে আলাপ করছে দুইজন, কিন্তু ডানে বামে দেখবেন অসংখ্য কিছু। কেউ এক্সপ্রেশন দিচ্ছে, কেউ স্রেফ অস্তিত্ব জানান দিয়ে এক্সট্রা লেয়ার যুক্ত করছে। প্রতিটা ফ্রেম ব্যস্ত, প্রতিটা ফ্রেমে সিনেমার প্রতি কমিটমেন্ট।

প্রতিটা ব্যক্তি এই সিনেমার প্রতিটা এক্সপ্রেশনের পরিপূরক। অ্যাকসেন্ট, গালি, আদর, মমতা—সবকিছুকে প্রাণ দেওয়ার জন্য চরিত্রদের অসম্ভব খাটুনি আপনার চোখে পড়বে। পান্না চরিত্রে আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদের কথা আলাদা করে বলতে ইচ্ছা করে। বলতে ইচ্ছা করে আলাদাভাবে সাদুর পাগল বউকে মারধর করা ক্রাউডে বিদ্যমান গ্রামের নারীরা, মেয়েরা—বলতে ইচ্ছা করে বিয়ে করে ফেরার পথে পাগল বউকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গ করতে থাকা কিশোরদের কথা। কম্পোজার বজায় রেখে চরিত্রের এমন অসাধারণ ব্লকিং আপনা-থেকেই হাতে তালি দেওয়াবে। আর্ট ডিরেকশন, প্রোস্থেটিকে, মেক-আপে, এডিটে, এমনকি স্ক্রিপ্ট যিনি সুপারভাইজ করেছেন—ইউ অল ডিড আ টেরিবল জব।

মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে চিনি কাইজারের মাধ্যমে, আমি যখন কাইজারের রিভিউ লিখেছিলাম—সেখানে অম্লান চরিত্রে মোনূই যে পারফর্ম করেছেন, ওয়ান অফ দি বেস্ট টিল ডেট। সেটার রিভিউও এই রইদের রিভিউর মতোই—যা ইচ্ছা করেছে, লিখে দিয়েছিলাম।

নাজিফা তুষিকে নিয়ে নূর ইমরানের মন্তব্য আমি হুবহু তুলে দিলাম, এটাও ঢাকা পোস্টের সাক্ষাৎকারে বলা : “আই বিলিভ, নাজিফা তুষি এই ছবির প্রাণ। পুরো ছবিটা আসলে সাধুর বউ মানে, পাগলীর উপরই। এত ভালো, এত সুন্দর, এত অসাধারণ সে! আগেও আমি বলেছি, তুষি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির ব্রাইটেস্ট স্টার। আগে যেমন অভিনেত্রীরা ববিতা-শাবনূরের মতো হতে চাইত, সামনে এমন সময় আসবে, যখন সবাই তুষির মতো হতে চাইবে। অনেকদিন পর এত ভালো একজন অ্যাক্টরের সঙ্গে কাজ করলাম। অসাধারণ এক্সপেরিয়েন্স। ‘রইদ’ যেমনভাবে করতে চেয়েছি, পেরেছি; এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমি সুমনভাই আর তুষিকে দিতে চাই।”

আমার পিওভি এক্সাক্টলি এটাই। নাজিফা তুষির সচেতন অভিনয় এবং নূরের সাথে নিজেকে ভাঙা—মার্ভেলাস, ওয়ান অফ আ কাইন্ড। হাওয়ার গুলতি এবং রইদের সাদুর বউ—নাজিফা তুষি আসলেই মনে রাখার মতো চরিত্র প্লে করেছে।

হাওয়ায় নাগু যখন গুলতিকে আবিষ্কার করে এবং দাবি করে সে মূলত জীবিত—তখন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির কথা শুরুতে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না৷ আট/নয়জন মানুষ, সমুদ্রের মাঝে হঠাৎ এক নারীকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পায়, ঝামেলা এড়ানোর জন্য যখন সমুদ্রে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়—ঠিক তখনই সিনেমার চরিত্রগুলোর চাঞ্চল্যকর ভাঙন আমরা পর্যবেক্ষণ করি। নারী চরিত্রটি আসলে অন্যসব পুরুষ চরিত্রগুলোর জন্য একটা ‘সিদ্ধান্ত’। যৌন আকর্ষণের চেয়ে অনেক বেশি ‘মানবিক’ আকুতি থাকার কারণে শেষপর্যন্ত গুলতি বোটে অবস্থান করার অনুমতি পায়৷

হাওয়ার মতো রইদে একটু ভিন্ন আকুতি—পাগল বউয়ের সাথে বোঝাপড়ায় হাজির হয় যৌনতা। এখানে চলে আসে ভায়োলেন্স, চলে আসে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নানান নখরামি। রইদে নারী/পাগলবউ পুরুষ চরিত্রগুলোর কাছে আর ‘সিদ্ধান্ত’ থাকে না, সেই অবজেক্টিভিটির জায়গা থেকে পাগল বউ বের হয়ে আসে। সিনেমায় সমাজের পুরুষদের দারুণ একটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় সাদুর পাগল বউ। নাজিফা তুষির এই বৃদ্ধাঙ্গুলি দীর্ঘজীবী হোক।

এই হলো মোটামুটি রইদ  নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত চিন্তা। এগুলো আজকেই গরম গরম দেখে এসে না লিখতে পারলে আর কখনোই হয়তো লেখা হতো না। ফলে সিনেমার অনেককিছু বাদ গিয়ে থাকতে পারে। একটা আনপ্ল্যানড লেখা হওয়ায় আমি প্রোবাবলি যেগুলো মাথায় নোট করে রেখেছিলাম—সেগুলোর কিছু কিছু মিস করে গেছি। রইদ  আদম হাওয়ার গল্প হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

আমি নির্দিষ্ট কোনো কনক্লুশনে যেতে চাইছিলাম না। সিনেমার এই খেলাটা মেজবাউর রহমান সুমন প্রোবাবলি বুঝে গেছেন। পার্ফেক্ট ডিউরেশন, যথাযথ কাট, প্রোপার মিউজিক, কোনো ফ্রেম বোরিং না রেখে সেখানে সুচতুরভাবে মুভমেন্ট ঢুকিয়ে দেওয়া—এগুলো আমরা বুঝি সুমন সাহেব, বুঝলেন কিনা। চোখের এহেন এক্সারসাইজ—সিনেমায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবহার করেছেন—সিনেমার প্রতি, আর্টের প্রতি আপনার এহেন অনেস্টি এবং চালাকি প্রশংসিত হবে, আমরা জানি।


রাশা নোয়েল
কবি, দাবাড়ু। সিনেমাপাঠক, সিনেমাক্রিটিক

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *