সমাজ

‘নিউইয়র্কের রাজা’ দাবি করা কুইন্সের সুপারমার্কেটমালিক অপহরণ মামলায় দোষী

শেয়ার করুন:

নিউইয়র্ক প্রতিনিধি 
কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকার এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুপারমার্কেটমালিক আবু চৌধুরীকে তিনটি সহিংস অপহরণ ও অপহরণের ষড়যন্ত্রের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছে নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতের জুরি। নিজেকে ‘কিং অব নিউইয়র্ক’ বলে পরিচয় দেওয়া ৩৬ বছর বয়সি আবু চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিতজনদের লক্ষ্য করে অপহরণ, নির্যাতন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি অফিস, ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্ক জানায়, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালতে দুই সপ্তাহের বিচার শেষে জুরি আবু চৌধুরীকে তিনটি অপহরণ এবং তিনটি অপহরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। জুরি প্রায় দুই ঘণ্টা deliberation করার পর রায় দেয়। প্রতিটি মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

 

তিন অপহরণের ঘটনায় যা প্রমাণিত হয়েছে

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১১ মে পর্যন্ত প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে তিন ব্যক্তিকে অপহরণের ঘটনায় আবু চৌধুরীর ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে।

প্রথম ঘটনা—২৭ মার্চ ২০২৩ :
জ্যামাইকার ১৮১ স্ট্রিট ও হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ের কাছে এক ব্যক্তিকে জোর করে একটি Honda SUV-তে তুলে নেওয়া হয়। আদালতে প্রমাণিত তথ্য অনুযায়ী, আবু চৌধুরী ওই ব্যক্তিকে গাড়ির ভেতর মারধর করেন এবং প্রায় ১৩ ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখেন। তাকে জোর করে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে তাকে ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি পান করানো হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরদিন হাসপাতালে জ্ঞান ফেরে।

দ্বিতীয় ঘটনা—১০ মে ২০২৩ :
আবু চৌধুরী ও তার তৎকালীন বান্ধবী এবং বর্তমানে স্ত্রী ইফফাত লুবনা একজন পরিচিত ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলে অপহরণ করেন। ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে লুবনার কলেজের সহপাঠী ছিলেন। লুবনার ব্যক্তিগত সুনাম নিয়ে ওই ব্যক্তি কী বলেছিলেন—এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে অপহরণ করা হয় বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীকে গাড়িতে মারধর, বেঁধে রাখা ও মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়। পরে তাকে একটি হোটেলে নেওয়া হয় এবং অন্য একজন অপহৃত ব্যক্তির ওপর হামলা করতে বাধ্য করা হয়।

তৃতীয় ঘটনা—১১ মে ২০২৩ :
আরেক ব্যক্তিকে জ্যাকসন হাইটসের একটি রেস্তোরাঁর সামনে দেখা করার কথা বলে ডেকে আনা হয়। সেখানে আবু চৌধুরী তাকে জোর করে একটি মিনিভ্যানে তুলে নিয়ে মারধর করেন। পরে তাকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রসিকিউটরদের প্রমাণ অনুযায়ী, সেখানে তাকে গুরুতরভাবে নির্যাতন করা হয় এবং তার বাবার কাছে ২০ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

তিন দিন পর ভুক্তভোগীকে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে হাত-পা বাঁধা ও চোখে কাপড় বেঁধে ফেলে রাখা হয়। তিনি নিজেই বাঁধন কামড়ে খুলে এবং একটি জানালা ভেঙে বাইরে বের হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে ৯১১-এ ফোন করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে এক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।

 

বাংলাদেশি কমিউনিটিকে লক্ষ্য করার অভিযোগ

মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের অধিকাংশেরই বাংলাদেশি পটভূমি রয়েছে। ২০২৪ সালের আদালতের নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণের ঘটনাগুলোতে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নিজেদের একই কমিউনিটির পরিচয় ও সম্পর্ককে কাজে লাগিয়েছিল।

এর আগে প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেছিলেন, একটি ঘটনায় ভুক্তভোগীকে কয়েক দিন আটকে রেখে মারধর করা হয় এবং তার হাত কেটে সেখানে মরিচের গুঁড়া ও লবণ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। আবু চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীকে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

 

সহঅভিযুক্তদেরও দোষী সাব্যস্ত

আবু চৌধুরীর আগে একই মামলার অন্য কয়েকজন সহঅভিযুক্তও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল ২০২৬ ইফফাত লুবনা অপহরণ ও অপহরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ২৬ জুন ২০২৬ সাইয়েদ রুবেল আহমেদ ও সুলতানা রাজিয়াও অপহরণের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

মামলায় আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। তাদের মধ্যে শাহেদ আলম ও রুহেল চৌধুরী নিজেদের ভূমিকার জন্য দোষ স্বীকার করেছেন এবং সাজা ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন।

 

এখন সাজা ঘোষণার অপেক্ষা

আবু চৌধুরীর সাজা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। ফেডারেল আদালতের মামলাটি ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। তদন্তে FBI ও NYPD-এর Joint Violent Crimes Task Force কাজ করেছে।

মামলার শুরুতে ২০২৩ সালে আবু চৌধুরী ও লুবনার বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের আদালতের নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে আরও একটি অপহরণের অভিযোগ সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুরি রায়ই প্রমাণিত অপরাধের মূল ভিত্তি।

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রায় তিনটি পৃথক অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় আবু চৌধুরীর দায় প্রতিষ্ঠা করেছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *