সংবাদ সাহিত্য

ভাষায় নিরঞ্জনের রঙ । বদরুজ্জামান আলমগীর

শেয়ার করুন:
আমাদের অঞ্চলে একটা কথা বলে- অলহম। অলহম মানে একদম নাড়ির ভিতর, ক্বলব- এমন কিছু। ইদানীং

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি শব্দ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ হচ্ছে; এখন তো আর তর্ক হয় না, কাদা ছোঁড়াছুড়ি আর দখলদারির জেল্লা হয়।

জুলাই ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকার দাবিদার কিছু ছেলে গালিগালাজ থেকে শুরু করে প্রতিরোধের ভাষায় নতুন কিছু শব্দ আমদানি করেছে- যেমন, ইনকিলাব, ওয়াদা, ফয়সালা, আজাদি, মজলুম, জালিম- এইসব। এই শব্দগুলোর মধ্যে একটা বলিয়ান দ্যোতনা আছে- তাতে কোন সন্দেহ নাই। এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় ছিল, আছে এবং থাকবে। একটি ভাষা এভাবেই সতেজ ও আপন, গতিশীল আর বিকাশমান।

কিন্তু সমস্যা অন্যখানে- আমরা বলি না যে নিয়ত গুণে বরকত। যারা পরিকল্পিতভাবে এই শব্দগুলো বলছে- তাদের নিয়ত খারাপ, ওই যে শুরুতেই বললাম অলহম- তাদের অলহম দুরভিসন্ধিতে ভরা।

এই ঘটনাগুলো কিন্তু ঠিক ছেলেখেলা, হেলাফেলায় হচ্ছে না; এর প্রত্যেকটাই একেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রকল্পের ফল। এবারকার একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরি দেখিনি, শুনিনি খালি পায়ে হৃদয়নিঙড়ানো- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি গান; তার জায়গায় শুনেছি ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান।

একটা জিনিস আপনাদের মনে করিয়ে দিই- দেখুন, জনপরিসরে কয়েকবছর আগেও আমরা খোদা হাফেজ কথাটা বলতাম, খোদা হাফেজ তারা পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দিয়েছে, এখন সবাই বলে আল্লাহ হাফেজ। কেননা, তাদের কাছে ফার্সি খোদা শব্দটি ধর্মীয়ভাবে যথেষ্ট মৌলবাদী নয়, তারা চায় পুরোপুরি আরবী আল্লাহ শব্দটিই থাকুক, এবং ক্রমান্বয়ে তা-ই হয়েছে।

কিন্তু খোদা শব্দের সাথে আমাদের বাপদাদা চৌদ্দ পুরুষের মায়ামহব্বত, আর দয়া ও দোয়ার আকুতি জড়িয়ে আছে। রমজানকে আর রমজান নয়, এখন রমাদান বলা হয়। রমজানকে রমাদান বলতে বলতে অদূর ভবিষ্যতে দেখবেন কাজী নজরুলের রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ- এই অসামান্য গানটিও অপসৃত হবে, কেননা ওখানে যে রমাদান নয়, রমজান বলা হয়েছে!

এই ঘটনাগুলো কিন্তু ঠিক ছেলেখেলা, হেলাফেলায় হচ্ছে না; এর প্রত্যেকটাই একেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রকল্পের ফল। এবারকার একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতফেরি দেখিনি, শুনিনি খালি পায়ে হৃদয়নিঙড়ানো- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি গান; তার জায়গায় শুনেছি ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান।

বাংলা ভাষায় এই শব্দগুলো এসেছিল আমাদের মরমি ইসলামের হৃদয় থেকে, বাংলার ফকির ফাকরা ও কৃষিজীবী মানুষের ক্বলব ছিঁড়ে। ইনকিলাবওয়ালারা একের পর এক মাজার ভেঙে দিচ্ছে, ফকির বাউলদের উচ্ছেদ করছে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক লাম্পট্য চরিতার্থ করার জন্য সুফি ফকিরদেরই ভাবনগরে গড়ে ওঠা, সত্যিকার দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের হাতে নতুনকরে উজ্জীবিত হওয়া শব্দগুলো ব্যবহার করছে!

আমাদের কৃষিপ্রাণ অর্গানিক ফল্গুধারার সাথে, সাতপুরুষের খাঁটি অভিব্যক্তিগুলোর নিরাপত্তায় আমরা যেন অষ্টপ্রহর জেগে থাকি।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *