সমাজ

তৃতীয় দেশে অভিবাসী বহিষ্কার বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন

তৃতীয় দেশে অভিবাসী বহিষ্কার বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন
শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তৃতীয় দেশে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বহিষ্কার আরও জোরদার করেছে। সরকারি তথ্য ও অধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এমন বহিষ্কারের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের অনেকেরই যেসব দেশে পাঠানো হচ্ছে, সেসব দেশের সঙ্গে আগে কোনো সম্পর্ক ছিল না।

ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহিষ্কার অভিযান পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তারা এখন দেশজুড়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করছেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রার্থীরাও রয়েছেন। আইন অনুযায়ী, নিজ দেশে ফেরত গেলে কী ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারেন, তা ব্যাখ্যা করার সুযোগ তাদের পাওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সনদের মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে পাঠানো নিষিদ্ধ, যেখানে তিনি নিপীড়ন বা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। তবে আটক অনেক অভিবাসী দাবি করছেন, নিজ দেশে ফিরে গেলে তাদের আহত বা হত্যার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অন্য দেশে পাঠানোর পথ বেছে নিচ্ছে।

‘তৃতীয় দেশে বহিষ্কার’ নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এবং জাতিসংঘ। সমালোচকদের বক্তব্য, যেসব দেশ বহিষ্কৃতদের গ্রহণ করছে, তাদের কয়েকটির নিজেদেরই মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার কিছু দেশ এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজ দেশের নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেয়।

অধিকারকর্মীরা আরও বলছেন, তৃতীয় দেশগুলো বহিষ্কৃতদের আশ্রয়ের আবেদন ন্যায্যভাবে বিবেচনা করবে—এমন নিশ্চয়তা খুব কম। শেষ পর্যন্ত এসব দেশ তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে, যেখানে তারা নিপীড়নের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা জানেন না, তাদের কোথায় পাঠানো হচ্ছে। নতুন দেশে গিয়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনি ব্যবস্থার সঙ্গে অপরিচিত থাকার পাশাপাশি কারও কারও কাছে পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্রও থাকে না।

এই ধরনের বহিষ্কার আগে থাকলেও অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের আগে এটি অত্যন্ত বিরল ছিল এবং বর্তমানে যে মাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে, এর নজির নেই। কিছু মার্কিন আদালত এই প্রক্রিয়াকে অবৈধ বললেও সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্তের পর তা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের নীতি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা তৈরি করছে এবং শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক নীতিকে দুর্বল করছে।

অধিকার সংগঠন রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ফার্স্টের হিসাব অনুযায়ী, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও আইনজীবীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে জোরপূর্বক তৃতীয় দেশে পাঠানো হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্যেও ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের ১৬ হাজারের বেশি ঘটনা পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টকে দেওয়া এই তথ্য প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় কম হতে পারে।

তৃতীয় দেশে বহিষ্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্মতি প্রয়োজন। তাই ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা করছে। এল সালভাদর ও ইসওয়াতিনি বহিষ্কৃতদের কারাগারে রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। অন্য কিছু দেশ সাময়িকভাবে তাদের গ্রহণ করছে। এসব দেশের কয়েকটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় সহযোগিতা চুক্তি করেছে, যার আওতায় বহিষ্কৃতরা তৃতীয় দেশে থেকে আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা, ব্যবসায়িক সুবিধা বা ভিসা-সংক্রান্ত ছাড়ের বিনিময়ে দেশগুলোকে বহিষ্কৃতদের গ্রহণে রাজি করাচ্ছে। লাইবেরিয়া সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রহণে সম্মত হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় ১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ক্যামেরুন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের গ্রহণে সম্মত হওয়ার পর সেখানে জাতিসংঘের শরণার্থী কার্যক্রমে ৩ কোটি ডলার এবং দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় আগামী কয়েক বছরে ৪০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *