আধুনিক বাংলা কবিতার দিকপাল নাগরিক কবি শামসুর রাহমান প্রধানত নাগরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, দ্রোহ, এবং মানবতাবাদী চেতনাকে কেন্দ্র করে তাঁর সাহিত্য সম্ভার সমৃদ্ধ করেছেন।শামসুর রাহমানকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ‘নাগরিক কবি’। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে ঢাকার ইট-পাথরের জীবন, যান্ত্রিকতার ক্লান্তি, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, ট্রাফিকের জ্যাম, এবং নাগরিক নিঃসঙ্গতা। শহুরে জীবনের নানা খুঁটিনাটি ও বাস্তবতা তাঁর ছন্দে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সাহিত্যের এক বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে। অবরুদ্ধ ঢাকায় বসে লেখা ‘বন্দী শিবির থেকে’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় রয়েছে যুদ্ধের সময়ের তীব্র আতঙ্ক, প্রতিরোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ এর মতো বিখ্যাত কবিতাগুলো বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য দলিল। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদকে নিয়ে লেখা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি তাঁর রাজনৈতিক চেতনার অনন্য নিদর্শন।তাঁর কবিতায় প্রেম ও রোমান্টিকতা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম, রোমান্টিক বিষণ্ণতা, এবং প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের টান খুব সহজ ও সাবলীল ভাষায় তাঁর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।শামসুর রাহমান ছিলেন অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। স্বৈরাচার, ধর্মীয় মৌলবাদ, এবং সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কলম ধরেছেন। তাঁর দ্রোহের ভাষা ছিল পরিশীলিত ও তীক্ষ্ণ, যা পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত করে। সমাজ, মানবতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা তাঁর সাহিত্যজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত পরিসরে। সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের দুঃখ-কষ্ট এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তিনি সাহিত্যের মূল উপজীব্য করেছেন।
কবিতার পাশাপাশি তিনি বিপুল গদ্য রচনা ও অনুবাদ করেছেন। বিভিন্ন ছদ্মনামে (যেমন সিন্দবাদ, জনান্তিকে, মৈনাক ইত্যাদি) তিনি সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে প্রচুর উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। এছাড়াও তিনি উপন্যাস, আত্মজীবনী এবং সাহিত্যের সমালোচনা ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন।সামগ্রিকভাবে, শামসুর রাহমানের সাহিত্য বাংলা ভাষা ও সমাজকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তা হয়ে উঠেছিল দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক।
শামসুর রাহমান বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত অনন্য নক্ষত্র। তাঁকে ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’ ও ‘নাগরিক কবি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শামসুর রাহমান ২৩ অক্টোবর ১৯২৯ সালে ঢাকার পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। পিতার নাম মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মাতার নাম আমেনা খাতুন। তাঁর ডাকনাম ছিল বাচ্চু।তিনি ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।কর্মজীবনের শুরুটা সাংবাদিকতাকেন্দ্রিক। ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীতে দৈনিক বাংলা) এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন।তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। নগরজীবনের একাকিত্ব, মধ্যবিত্তের মানসিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশপ্রেম তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য। রোমান্টিকতা ও সমাজমনস্কতার সংমিশ্রণে তিনি একটি স্বতন্ত্র নাগরিক কাব্যধারা নির্মাণ করেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর কবিতা ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস।‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিতা হিসেবে স্বীকৃত।১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’।এছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ রৌদ্র করোটিতে,বিধ্বস্ত নীলিমা,বন্দী শিবির থেকে,বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে,উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ,বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। কবিতার পাশাপাশি তিনি উপন্যাস, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনীমূলক রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’ এবং উপন্যাস ‘অক্টোপাস’ উল্লেখযোগ্য। তিনি শেক্সপিয়রের হ্যামলেট ও সফোক্লিসের ইলেক্ট্রাসহ বিভিন্ন ধ্রুপদী সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেন।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৬৯, একুশে পদক ১৯৭৭, স্বাধীনতা পুরস্কার ১৯৯১, আনন্দ পুরস্কার (ভারত) ও অন্যান্য সম্মাননা প্রদান করা হয় স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমানকে। শামসুর রাহমান কেবল একজন কবি নয়,অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তার সাহসী কণ্ঠস্বর। ১৭ আগস্ট ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্তেকাল করেন।
২.
কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়েআমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।
যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি,যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়িয়ে বেড়ানোবয়সের কাছাকাছি হয়তো তখনো কোনো গানলতিয়ে ওঠেনি মীড়ে মীড়ে দুপুরে সন্ধ্যায়,পাছে গুরুজনদের কানে যায়। এবং স্বামীর সংসারে এসেও মা আমার সারাক্ষণছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিণী। যতদূরজানা আছে, টপ্পা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখলকোনোদিন। মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকেঅথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোনধুয়ে মুছে বাসন-কোসনসেলাইয়ের কলে ঝুঁকে, আলনায় ঝুলিয়ে কাপড়,ছেঁড়া শার্টে রিফু কর্মে মেতেআমাকে খেলার মাঠে পাঠিয়ে আদরেঅবসরে চুল বাঁধবার ছলে কোনো গান গেয়েছেন কি না এতকাল কাছাকাছি আছি তবু জানতে পারিনি।
যেন তিনি সব গান দুঃখ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে রেখেছেন বন্ধ ক’রে আজীবন, এখন তাদের গ্রন্থিল শরীর থেকে কালেভদ্রে সুর নয়, শুধু ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে !
(কখনো আমার মাকে।। শামসুর রাহমান)
কবিতাটি মায়ের নীরব, আত্মগোপন করা জীবন এবং তার অব্যক্ত অনুভূতির প্রতি সন্তানের গভীর উপলব্ধি ও বেদনামিশ্রিত বিস্ময়।কবি স্মরণ করেন যে তিনি কখনো তাঁর মাকে গান গাইতে শোনেননি। শৈশব, কৈশোর, বিবাহিত জীবন—প্রতিটি পর্যায়ে মা সংসারের কাজ, দায়িত্ব ও ত্যাগের ভেতর নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ, স্বপ্ন বা শিল্পীসত্তার কোনো প্রকাশ ঘটেনি। হয়তো মায়ের মনেও গান ছিল, সুর ছিল, কিন্তু সামাজিক বিধিনিষেধ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের কারণে সেসব চিরকাল অন্তরালেই থেকে গেছে।কবির মনে হয়, মা যেন তাঁর সমস্ত গান ও অনুভূতিকে একটি বন্ধ কাঠের সিন্দুকে বন্দি করে রেখেছেন। সেই সিন্দুক থেকে আজ আর কোনো সুর ভেসে আসে না; আসে শুধু পুরোনো স্মৃতি, বেদনা ও বিস্মৃত জীবনের প্রতীকী ‘ন্যাপথলিনের গন্ধ’। এভাবে কবিতাটি বাঙালি মায়েদের নিঃশব্দ ত্যাগ, আত্মবিসর্জন এবং অপ্রকাশিত সত্তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরে।
এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?
তেমন যোগ্য সমাধি কই?
মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো
অথবা সুনীল-সাগর-জল
সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই!
তাই তো রাখি না এ লাশ আজ
মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,
হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।
(এই লাশ আমরা রাখবো কোথায় ।। শামসুর রাহমান)
একজন মহান, অসাধারণ ও প্রিয় মানুষের মৃত্যুর পর তার মরদেহকে কোথায় সমাহিত করা হবে, সেই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে কবি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কবির কাছে পৃথিবীর কোনো সমাধি, কোনো পর্বত, কোনো সাগরই সেই মানুষের মর্যাদার সমতুল্য নয়। তাই তিনি মনে করেন, এমন মানুষের প্রকৃত স্থান কোনো ভৌত সমাধিক্ষেত্রে নয়; বরং মানুষের হৃদয়ের গভীরে।কবিতাটি প্রতীকী অর্থে বোঝায় যে, মহান মানুষের দেহ মাটিতে মিশে গেলেও তাঁর আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। মানুষের ভালোবাসা ও স্মরণই তাঁর সবচেয়ে যোগ্য সমাধি। তাই কবি ঘোষণা করেন—এই লাশের ঠাঁই মাটি, পাহাড় বা সাগরে নয়; মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে।বাংলা ভাষা ও বর্ণমালার প্রতি কবির গভীর প্রেম, মমতা, কৃতজ্ঞতা এবং বর্তমান অবমাননাকর পরিস্থিতি নিয়ে বেদনা জন্মেছিলো।
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলিশৈশবে ‘পাখী সব করে রব’ ব’লে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন পরস্পর মমতায় লীন,
ঘুরেছি কাননে তাঁ নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।
আজন্ম আমার সাথী তুমি,
আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে,
তাই তো ত্রিলোক আজ সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে
আমারই বন্দরে।
গলিত কাচের মতো জলে ফাত্না দেখে দেখে রঙিন মাছের
আশায় চিকন ছিপ ধরে গেছে বেলা। মনে পড়ে কাঁচি দিয়ে
নক্সা কাটা কাগজ এবং বোতলের ছিপি ফেলে
সেই কবে আমি হাসিখুশির খেয়া বেয়ে
পৌঁছে গেছি রত্নদীপে কম্পাস বিহনে।
তুমি আসো আমার ঘুমের বাগানেও
সে কোন্ বিশাল
গাছের কোটর থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে আসো,
আসো কাঠবিড়ালির রূপে,
ফুল্ল মেঘমালা থেকে চকিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো ঐরাবত সেজে,
সুদূর পাঠশালার একান্নটি সতত সবুজ
মুখের মতোই দুলে দুলে ওঠো তুমি
বার বার কিম্বা টুকটুকে লঙ্কা ঠোঁট টিয়ে হ’য়ে
কেমন দুলিয়ে দাও স্বপ্নময়তায় চৈতন্যের দাঁড়।
আমার এ অক্ষিগোলকের মধ্যে তুমি আঁখিতারা।
… …
হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মিলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?
উনিশ শো’ বাহন্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
সে ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে
কতো নোংরা হাতের হিংশ্রতা ধেয়ে আসে।
(বর্ণমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা।। শামসুর রাহমান)
কবি বাংলা বর্ণমালাকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে কল্পনা করেছেন। শৈশবের পাঠশালা, স্বপ্ন, কল্পনা, আনন্দ, প্রকৃতি ও জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও বর্ণমালা জড়িয়ে আছে। ভাষা কবির কাছে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি তাঁর চেতনা, স্মৃতি, স্বপ্ন ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। তাই তিনি বর্ণমালাকে “আঁখিতারা”, “জলজ্বলে পতাকা” ইত্যাদি রূপকে মহিমান্বিত করেছেন।কবিতায় ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিও উজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে। ভাষার জন্য শহিদদের আত্মত্যাগকে কবি “রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি” বলে উল্লেখ করেছেন। সেই গৌরবময় ইতিহাস ভাষাকে আরও মহিমান্বিত করেছে।কিন্তু কবির বেদনা এই যে, যে ভাষা এত ত্যাগ ও ভালোবাসার উত্তরাধিকার বহন করে, আজ তাকে ঘিরে অশালীনতা, অবক্ষয়, কুরুচি ও অবমাননার চর্চা দেখা যাচ্ছে। ভাষার এই অবনতি কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
৩.
কবিতার সাধনামগ্নকবি শামসুর রাহমান-কে “নিঃসঙ্গ শেরপা” বলা হয় মূলত তাঁর কবিসত্তার প্রতীকী পরিচয় হিসেবে। এই উপমাটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে কবি হুমায়ুন আজাদ-এর সমালোচনাগ্রন্থ শামসুর রাহমান : নিঃসঙ্গ শেরপা গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে।
তুমি হে সুন্দরীতমা
নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলতেই পারো ‘এই আকাশ আমার’
কিন্তু নীল আকাশ কোনো উত্তর দেবে না।
(উত্তর ।। শামসুর রাহমান)
এই কবিতায় কবি প্রেমের এক মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করেছেন—জড় প্রকৃতি মানুষের দাবির কোনো উত্তর দেয় না, কিন্তু মানুষ ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দেয়।কবিতার শুরুতে আকাশ, ফুল ও জ্যোৎস্নার উদাহরণ এসেছে—”এই আকাশ আমার”, ”ফুল তুই আমার”, ”এ জ্যোৎস্না আমার”… এগুলো মানুষের অধিকারবোধের প্রকাশ। কিন্তু আকাশ, ফুল কিংবা জ্যোৎস্না কোনো প্রতিবাদ বা সম্মতি জানায় না। কারণ তারা প্রকৃতির অংশ, তাদের অনুভূতির ভাষা নেই।কিন্তু যখন প্রেয়সী একজন মানুষকে বলে—”তুমি একান্ত আমার”, তখন কবি আর নীরব থাকতে পারেন না। কারণ মানুষের হৃদয় আছে, অনুভব আছে, ভালোবাসার প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা আছে। ”তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, আমি তোমার, তুমি আমার।” এখানে প্রেম একতরফা নয়; এটি পারস্পরিক আত্মসমর্পণ। “তারায় তারায় রটিয়ে দেবো”—অতিশয়োক্তির মাধ্যমে প্রেমের উল্লাসকে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দেওয়া হয়েছে।
কেবল কয়েক ছত্র কবিতার জন্যে
এই বৃক্ষ, জরাজীর্ণ দেয়াল এবং
বৃদ্ধের সম্মুখে নতজানু আমি থাকবো কতোকাল?
বলো কতোকাল?
(একটি কবিতার জন্য।। শামসুর রাহমান)
এই কবিতায় কবি কবিতা সৃষ্টির প্রকৃত উৎস ও সাধনার কথা গভীর প্রতীকী ভাষায় প্রকাশ করেছেন। কবি বৃক্ষ, জীর্ণ দেয়াল এবং বৃদ্ধের কাছে একটি কবিতা প্রার্থনা করেন। কিন্তু তারা কেউই সরাসরি কবিতা দিতে পারে না; বরং প্রত্যেকে বলে যে তাদের অন্তর্গত সত্তা, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের সঙ্গে একাত্ম হতে পারলেই কবিতা পাওয়া সম্ভব।
বৃক্ষের মজ্জায় মিশে যাওয়া প্রকৃতির গভীরে প্রবেশের প্রতীক, জীর্ণ দেয়ালের ইঁট-সুরকির ভেতর নিজেকে গুঁড়িয়ে দেওয়া ইতিহাস ও সময়ের ক্ষয়কে উপলব্ধি করার প্রতীক, আর বৃদ্ধের মুখের রেখাবলী নিজের মুখে ধারণ করা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে আত্মস্থ করার প্রতীক। অর্থাৎ কবিতা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; এটি গভীর অনুভব, আত্মনিবেদন, অভিজ্ঞতা এবং জীবনবোধের ফসল।কবিতার শেষাংশে কবির প্রশ্ন—“কতোকাল?”—কবিসত্তার অস্থিরতা ও সৃষ্টির জন্য দীর্ঘ সাধনার কষ্টকে প্রকাশ করে। এখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রকৃত কবিতা অর্জনের জন্য মানুষকে প্রকৃতি, ইতিহাস এবং মানবজীবনের গভীর সত্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে যেতে হয়।প্রকৃত কবিতা সহজে লাভ করা যায় না; গভীর জীবনানুভূতি, আত্মনিবেদন, প্রকৃতি-ইতিহাস-মানবজীবনের সঙ্গে একাত্মতা এবং দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়েই সত্যিকারের কবিতার জন্ম হয়।
মেকদাদ মেঘ। কবি ও গদ্যকার



