সাহিত্য

একগুচ্ছ কবিতা || বদরুজ্জামান আলমগীর

শেয়ার করুন:

|| ফিলাডেলফিয়ার বেহুলা ||

মহাসড়ক আই ৯৫ বা দীঘল ২৭৬ আজ
সহসা নদী হয়ে যায় ফের বহুদিন পর
নির্লিপ্ত মহাসড়ক গাঙুর নদী হয়ে যায়।

নিউ ইয়র্ক শহর কেমন করে যেন আজ
ইন্দ্রের সভা হয়ে ওঠে। ভেরাজোনা ব্রিজ
চিরচেনা ব্রিজ আর থাকে না—বাসকপাতায়
মোড়ানো তোরণের আহবান হয়ে পড়ে।

সাদা বেহুলা শ্যামলা লখিন্দর কোলে পাড়ি দেয়
অজানা স্বর্গপুরীর দিকে, যায় আর বলে সে—
দাও গো আমায় হাতের আলপনা মেহেদি
কপালের উজানে সিঁথির মোড়ে পরিয়ে দাও
আমার ব্যাকুল সিঁদুর। আমি অভাজন, চিনি
না, চিনতে পারি না তোমাদের রীতি ও সমাজ।

দেখো আমি অঙ্গে তুলেছি সময়ের জরুল
তোমাদের মেঘমালা মেধা আর প্রার্থনার জল
তুলেছি মাথায়, বাঞ্ছা করেছি অসিক্ত পরাগে
লহো, লহো আমারে হৃদরক্তের ভঙ্গুরে, মোহে
লখিন্দর ছাড়া ফিরবো না—শুভ্র মেয়েটি কহে।।

 

|| বিহঙ্গ প্রণাম ||

তাহলে রান্নাঘরও হিমঘরে যেতে পারে অকাল
হিমঘরে যেতে পারে অতীশের জন্য তুলে রাখা
দরজার সামনে একজোড়া আনকোরা স্যান্ডেল,
কাজ থেকে ফেরা ছেলের মুখমোছা শাড়ির আঁচল।

রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পড়া পুরু রিডিং গ্লাস
ফেলে গ্যাছো—ফেলে গেছো কী ছোট ল্যাপটপ?
পাথর বাজাতে বাজাতে যাও চোখের জলের ঘুঙুর,
আগুনের ইশকুলে তুমিই ছোঁয়াবে বরফের উত্তাপ।

আজ তবে পেয়েছি অমৃত অভিজ্ঞান—স্নেহ পিরামিড
উপরে যায় কাঁটাতারহীন এমন আকাশের সামিয়ানা
সংকীর্তনে মাতে সারাদুনিয়ার স্তব্ধতা জানা অজানা
কাঁপছে কেবল হৃদবাগানে বোবা বিস্তারের অর্কিড।

নামহীন গোত্রহীন মানব জাতির বিষন্ন রঙিন সুনাম
প্রজাপতির পাখায় উড়ে যাচ্ছে পুষ্প ও বিহঙ্গ প্রণাম।

 

|| ঘাতক দেবশিশু ||

বহুদূর থেকে কতোদিন পর প্রাণের মানুষটি নামবে এসে
আমরা বিমান বন্দরে অপেক্ষার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি,
কাউকে কিছু হয়তো বলি না,
হুহু করে কাঁদি না, আনন্দে ঠাঠা করে হাসি না
কেবল গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকি,
কাপড় জামা ধোপদুরস্ত, তারপও যে কেউ
বলতে পারে আমাদের মুখ কত ধূসরতায় সন্ধ্যার দিকে
হেলে পড়ে- কোন ফেস্টুনে লেখা থাকে
এই ভাঙনের ইতিকথা, বিগত দিনের পাতাবাহার?

চোখের বারান্দার নিচে চাপিলা মাছের
চঞ্চল ও মশগুল কাজলকাটা ইশকুল দেখলে,
চাঁদের ধূলায় যে কুশিকাঁটায় তোলে
পদ্মপাতার মাজেজা ও হাওয়ার সঞ্চারী—না বললেও
কে না জানে সে এসেছে বিলের দেশের গ্রাম থেকে
সে যে গলায় রক্ত তোলা সুফি ও ঘাতক ডাহুকী।

পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতে থাকলে,
কী খাঁজকাটা বিকালের ইজেলে স্মৃতি বিস্মৃতি
চোবানোর মাহফিলে আসন পেতে মিশে গেলে
আপনাআপনি বুঝতে পারি—
পাশেই হয়তো ঢালুর নিচে, অথবা গ্রামের
তেমাথার মুখে একটি কবরখানা আছে।

এই বোধগুলো কোত্থেকে আসে
কে এসে স্তব্ধতায় জানান দেয়, দিনদুপুরে মেলে ধরে
শেওলা পড়া রাতের খোয়াবনামা?

একজন পঁচিশোর্ধ মেয়ের দাঁড়ানোর ভঙ্গি বুঝে
কোন কারণ ছাড়াই ছিন্ন হাসি দেখে
বুঝতে পারি ওর ঘরে একটি বাচ্চা শিশু আছে—
সে তার বুকের দুধের জন্য অপেক্ষা করে।

পেছনে অনিমেষ তাকিয়ে দেখি মায়ের ভেজা মুখ
বাবার চোখে সঞ্চারিত গমক্ষেতের ঢেউ
দিগন্তলীন মাঠের ইজেলে ভাসে অশীতিপর বুড়োর
মুখে নবজাতক শিশুর হাসি আর ভাতের বলক—
জানালার পাট খুলতেই দেবশিশু ওড়ে, দেবশিশু।।

 

|| ভাঙা আগুনের পুরাণ ||

আমাদের দু’চোখ আধ-খাওয়া অমা বেদানার ফল।
সময়ের নির্বিকার ফেরেশতা দেখো গর্ভবতী আজ
সবাই একটি সম্মিলিত সন্তানের আশায় ঝিমুই,
মাথা নুয়ে বিধবা রাত্রি সরে সরে যায় নীল শঙ্খচিল।

একা মাড়িয়ে যাই বসন্তের মোরাকাবা, নোনাজল,
উড়ে যাই ক্ষুধাভরা বৃক্ষের নক্ষত্র তারার বিভায়,
এভাবে তামাম দুনিয়া মধ্যরাত—গোল হয়ে আসে
তোমার আমার দিব্য চোখে একা সুইয়ের আগায়।

প্লাস্টিকে মোড়ানো দেহকাল জন্মের অধিক একা
শোকহীন অতল কবরে হাতের ফুল মোহনায় নামে,
খোয়াবে ঢালুর খোঁয়ারি—জঙলা বনের কাজলরেখা
রাঙা ফেরেশতার ডানায় পাবো বতুয়া শাকের দেখা।

শস্যগন্ধা রক্ততিলক জলমাটির শঙ্কিত অফুরান
আদিম গুহা হোমোস্যাপিয়ান ভাঙা আগুন পুরাণ।

 

|| অপূর্ণতার দিগ্বিদিক ||

বসে আছি সবার সাথে নিরুদ্র সামার বিকেলের হাতে
হাসিমাখা বাচ্চারা, হাতে ধরা সাফল্যের কোরক,
একই মঞ্চে নাচ হয়, গান ওড়ে—পাথেয় কথা বলেন
ফিলাডেলফিয়ার মেয়র, কাউন্সিলম্যান, অধ্যাপক।

সারি সারি হাই স্কুল গ্রেজুয়েট, তাদের শঙ্কিত বাবা-মা
কোন কারণ ছাড়াই জানালার কাচ গলিয়ে বাইরে চায়
আকাশ কেন যে গম্ভীর আজ—আকাশ কী পুত্রহারা মা?
একঝলকে তবলা, বাঁশি, মন্দিরা, হারমোনিয়ামের
গমকে খলবল লাফায় লাউনের বিল, স্তব্ধ জলাধার।

একলহমায় সবকিছু, হাই ইস্কুলের ভিতরের ভিড়ভাট্টা
তোপখানা মোড়, শহীদ মিনারের পায়ের নিচে চমকায়
কামরুদ্দীন আবসার পুরো চশমা চোখে তীব্র গান ধরেন—
শিল্পী সংগ্রামী পল রোবসন—ওরা জীবনের গান গাইতে
দেয় না—শিল্পী সংগ্রামী পল রোবসন—ও পল রোবসন!

আমি ফিলাডেলফিয়ায় যে হাই ইস্কুলের অডিটোরিয়ামে
বসে থাকি—পল রোবসন হাই স্কুল, দেয়ালে আঁকা রোবসন।
তিনি আঁকা হেমাঙ্গ বিশ্বাসে, কামরুদ্দীন আবসারে,
কর্মময় হাতে আমাদের শহীদ মিনারে খোয়াবের অপূর্ণতায়!

 

|| ফিলাডেলফিয়ার শিব ||

এই এক শহর চাঁদ থেকে ঝরে পড়ে ঘন্টাধ্বনি
আমেরিকার প্রথম চিড়িয়াখানা প্রথম হাজত
সাউথ স্ট্রিটে প্রথম ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট।

প্রথম যে খুচরো পয়সা বেরিয়েছিল ফিলাডেলফিয়ায়
তার ঝনৎকার এখনও বাজে কালো নেইবারহুডের
আকস্মিক জেনট্রিফিকেশনে উপড়ে ফেলা
পুরনো দালানের ঠাঁই বসে পড়ায়।

এখানেই গড়ে উঠেছিলেন নোয়াম চমস্কি
অ্যালেন আইভারসন, কোবি ব্রায়েন্ট, কেভিন হার্ট,
রিচার্ড গিয়ার, র‍্যাবেনের বীজদানাসহ মূল লেখাগুলো
অ্যালান পো লিখেছিলেন এই শহরের কিনার ঘেঁষে।
এই মোকামে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

এজরা পাউন্ড আর উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের
দোস্তি হয় এখানে এই শহরে। পল রবসন ছিলেন এখানে
বেশ কিছুদিন। এখনও জেলে ব্ল্যাক প্যান্থার মুমিয়া
আবু জামাল- আমরা যার মুক্তির জন্য রাস্তায় নামি।

এখানে আপার ডারবি হাই ইস্কুলে বাচ্চারা ৫২টি
ভাষায় কথা বলে, ভ্যালি ফোর্জ পার্কে জর্জ ওয়াশিংটন
একদম জীবন্ত, মনে হবে এই তো মার্চ পাস্ট করে যাচ্ছেন
কিছুটা ঢালুর দিকে। আমেরিকার সংবিধান লেখা হয়েছিল এখানেই।

ওখান থেকেই উঠে আসেন লুই কাহন
বারবার ঘুরে ঘুরে দেখেন—
ঢাকার শেরে বাংলা নগরে সংসদ ভবনের চারপাশে
জলাশয় হলে, বিলের ঘেরাও হলে কেমন লাগবে—
কেমন দেখাবে ঢাকা নগরের কংক্রিটে
যদি শাপলা ফুটে থাকে, কেমন মানাবে তাহলে,
এই শহর কী দয়ায় ভরে যাবে একদিন, ভেসে যাবে বানের তোড়ে?

লুই কাহন তার পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া
শিশুটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসেন- শিশুটি যে
ফিলাডেলফিয়ার আরেক বিপুল আবিষ্কার বাবল গাম চিবুচ্ছিল।

এডগার অ্যালান পো বাল্টিমোরে কী চোখে দেখতে পাননি?
বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের আবিস্কার করা স্ট্রিট লাইটের
আলো তো ছিল অ্যালান পো’র চোখে।
ফিলাডেলফিয়ায় ৩০ স্ট্রিট রেলস্টেশন থেকে
ট্রেনে চেপে সেই যে গেলেন বাল্টিমোর—আর ফিরে এলেন না।

এতো আলো আর অভিমানের শহরেই আছে এক
কেনজিংটন পাড়া—এই আলোকিত নক্ষত্র ক্ষয়ের
করপোরেট দুনিয়ায় শতসহস্র শিব ঠাকুরের দিনযাপন
নিশিযাপন পাড়া—হেরোইন, ফেন্টালিন আর কোকেইনের
ঘোরে কাঁপে, ঘুমায়, ঘুম ঘুম কাতরায়—স্বপ্ন আর
জাগরণের পুলসিরাত ফিলাডেলফিয়ার কেনজিংটন।

বিদ্যুতের থিকথিকে অমা পান করে তারা
রাস্তার উপর ছেঁড়া কম্বলের নিচে যৌনমিলনে
ধুঁকে ধুঁকে জ্বলে তারা, নুয়ে রয়,
তমসার হিল্লোলে উড়তে থাকে, দুলতে থাকে,
চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে থাকে কালের শিবেরা।

তারা খায় নিদারুণ সময়ের কালশিটে ও গন্ধম
ঘুমালে তারা উড়তে থাকে, জাগরণে উড়তে থাকে
আই ৯৫ মহাসড়ক দাবড়ে ছোটে এলান মাস্কের টেসলা

দুনিয়া ঠাণ্ডায় ঘামতে থাকে—গো ফ্লায়ার্স!


বদরুজ্জামান আলমগীর। কবি ও নাট্যকার

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *