সমাজ সাহিত্য

গাছবাড়িতে এক বিকেল । আ হ ম দ সা য়ে ম

শেয়ার করুন:

মানুষের ক্ষুধা একরকম নয়। আমরা সাধারণত ক্ষুধা বলতে পেটের ক্ষুধাকেই বুঝি; মনে করি, খাদ্য গ্রহণ করলেই তার অবসান। অথচ মানুষের ভেতরে আরও কত রকম ক্ষুধা বাস করে—জানার ক্ষুধা, সৌন্দর্যের ক্ষুধা, সংলাপের ক্ষুধা, স্বীকৃতির ক্ষুধা, ভালোবাসার ক্ষুধা, এমনকি নীরবতারও ক্ষুধা আছে। কেউ কেউ এ কথা মানতে চান না, কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ শেষপর্যন্ত মানুষকে এই সত্য মেনে নিতেই শেখায়।

গতকাল, ২৭ জুন, আমরা ক’জন একত্র হয়েছিলাম, তাদের কেউই আহারের টানে আসিনি। আমরা এসেছিলাম অদৃশ্যের ক্ষুধা মেটাতে; ভাষার কাছে বসতে, কবিতার কাছে ফিরতে, মানুষের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে। কারও হাতে ছিল নিজের লেখা, কারও হাতে প্রিয় কবির বই, কেউ এসেছিলেন শুধু শুনতে, কেউ বা নিজের ভেতরের কথাগুলো অন্যের কাছে সমর্পণ করতে। মানুষ যখন এমনভাবে মিলিত হয়, তখন সে শুধু একটি আড্ডায় অংশ নেয় না; সে তার ভেতরের মানুষটিকেও খানিকটা নতুন করে আবিষ্কার করে।

এই মিলনস্থল ছিল কবি কাউসারী মালেক রোজী আপার বাসা—’গাছবাড়ি’। নামটি শুনলেই যেন একটি দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সত্যিই, চারপাশজুড়ে গাছের এমন নিবিড় উপস্থিতি যে বাড়িটিকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। একটু নীরবতা নেমে এলে আশপাশে হরিণ চলে আসে, পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ছোট্ট ছররার (Creek) জলের শব্দ বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। প্রকৃতির এমন সহাবস্থান মানুষকে অজান্তেই ধীর করে দেয়। মনে হয়, সাহিত্য আসলে কংক্রিটের দেয়ালের চেয়ে গাছের ছায়াতেই বেশি স্বস্তি খুঁজে পায়।

আড্ডার শুরুতে রোজী আপা একটি স্মৃতি শোনালেন। বললেন, তাঁর সন্তানরা একসময় এই বাড়ির নাম দিয়েছিল- ট্রিহাউজ। কিন্তু তিনি নামটি বাংলায় রূপান্তর করে রাখেন- গাছবাড়ি। পরে সেই নামই ধীরে ধীরে আমাদের বুকে চারা হয়ে ফোটে- গাছবাড়ির কবিতা নামে।

তিনি আরও বললেন, প্রায় আঠারো বছর আগে এই বাড়িতেই আশপাশের বিদেশি বন্ধুদের নিয়ে নিয়মিত সাহিত্য-আড্ডা বসত। সবাই নিজেদের লেখা পড়তেন, সদ্যপঠিত বই নিয়ে আলোচনা করতেন, মতবিনিময় করতেন। সময়ের নিয়মে সেই মানুষগুলো আজ আর নেই; অনেকেই আকাশের তারা হয়ে গ্যাছে, কেউ চলে গ্যাছে অন্য শহরে বা পাড়ায়, কেউ বয়সের ভারে ঘর ছেড়ে বের হতে পারে না আর। কিন্তু ঘরটি রয়ে গেছে—অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষাকে অর্থবহ করতেই তাঁর প্রস্তাব, অন্তত মাসে একদিন আমরা যেন এখানে মিলিত হই; নিজেদের লেখা, প্রিয় বই কিংবা যে কোনো সাহিত্যভাবনা নিয়ে কথা বলি। কারণ পাঠকহীন সাহিত্য যেমন অপূর্ণ, তেমনি সংলাপহীন পাঠও একসময় একাকিত্বে শুকিয়ে যায়।

আমরা সবাই প্রস্তাবটি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করি। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, এই আড্ডার লেখাগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে একটি ছোট পত্রিকাও প্রকাশ করা যেতে পারে। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও তৈরি করা হয়। তবে পত্রিকার নাম ‘গাছবাড়ির কবিতা’ রাখা সম্ভব নয়, কারণ রোজী আপা একই নামে একটি বই প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই নতুন একটি নামের সন্ধানও শুরু হলো।

এরপর অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্। তিনি একে একে সবাইকে কবিতা পাঠ ও মতামত দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। উপস্থিত ছিলেন জোহরা খাতুন কলি, আব্দুল হাফিজ চৌধুরী ইমু, আলী সিদ্দিকী, নার্গিস পারভীন, সাহিদা আফরোজ নীপু, কাউসারী মালেক রোজী, অভিষেক চৌধুরী, বদরুজ্জামান আলমগীর এবং আমি আহমদ সায়েম।

দিনের শেষে মনে হলো, সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ বারবার একত্র হয়েছে খাদ্যের জন্য, নিরাপত্তার জন্য, রাষ্ট্র গড়ার জন্য। কিন্তু মানুষকে মানুষ করে রেখেছে আরেক ধরনের সমাবেশ—যেখানে কয়েকজন মানুষ একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে বসে, একটি বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টায়, একটি বাক্য নিয়ে তর্ক করে, আবার নীরবে সম্মতিও জানায়,কী ভিতরে ভিতরে ক্ষিপ্ত হয়। সেই সমাবেশই হয়তো প্রমাণ করে, পেটের ক্ষুধা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু মননের ক্ষুধা-ই মানুষকে মানুষ করে তোলে।

ডেস্ক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *