রাজনীতি

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবন ও রাজনীতি

শেয়ার করুন:

বাংলাদেশের একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১২ জুলাই ২০২৬ রবিবার ৯৪ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রয়েছে এক বর্ণাঢ্য জীবন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় জমির উদ্দিন সরকার গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জমির উদ্দিন সরকার। এইচএম এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরলে জমির উদ্দিন সরকারকে প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, পরে শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে বিএনপির স্বল্পকালীন সরকারে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। ওই সময়ই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান সংবিধানে যুক্ত হয়। ২০০১ সালে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় ফিরলে অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জমির উদ্দিন সরকার। ২০০৬ সালে বিএনপির সেই সরকারের মেয়াদ শেষে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। জরুরি অবস্থার সেই সময় পেরিয়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন হয় এবং তাতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে নবম সংসদের নতুন সদস্যদের জমির উদ্দিন সরকারই শপথ পড়ান। নতুন স্পিকারের দায়িত্বগ্রহণের মধ্য দিয়ে ওই বছর ২৫ জানুয়ারি জমির উদ্দিন সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জমির উদ্দিন সরকারের জন্ম। তার বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে লন্ডনের লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সনদ পান। দেশে ফিরে ১৯৬০ সালে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে জমির উদ্দিন সরকার সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পান। ছাত্রজীবনে, ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। পরে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে হাই কোর্টের আইনজীবীদের যে গ্রুপটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল, জমির উদ্দিন সরকার তাদের অন্যতম। জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল বা জাগদল গঠন করলে তাতে যোগ দেন জমির উদ্দিন সরকার। পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। আমৃত্যু তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

জমির উদ্দিন সরকার ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এবং ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে নিজের পুরনো আসন পঞ্চগড়-১ থেকে সংসদে যান এই বিএনপি নেতা। ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে জিতে নবম জাতীয় সংসদের সদস্য হন জমির উদ্দিন সরকার। বিভিন্ন সময়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের লেখা বইয়ের মধ্যে আছে ‘গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’, ‘এক নজরে সংসদ সম্পর্কিত বিধিবিধান’, ‘লন্ডনে শিক্ষা জীবন’, ‘দি ল অব দি সি’, ‘লন্ডনে ছাত্র আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ও ডিগবাজি’, ‘পল রাজ থেকে পলাশী এবং ব্রিটিশ রাজ থেকে বঙ্গভবন’, ‘ল অব দি ইন্টারন্যাশনাল রিভারস অ্যান্ড আদার ওয়াটারকোর্স’ প্রভৃতি।

জমির উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে ইন্তেকাল করেন। তাদের এক মেয়ে নিলুফার জমির এবং দুই ছেলে নওশাদ জমির ও নওফেল জমির। বড়ছেলে নওশাদ জমির বর্তমানে পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য।

বিএনপির এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক এবং আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


ডেস্ক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *