—নিহত অন্তত ১৬৫, নিখোঁজ হাজারের কাছাকাছি
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে কয়েক শ বিদেশি নাগরিক ও পর্যটক রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ এই দুর্যোগ আঘাত হানে। প্রবল স্রোতে নদীর তীরবর্তী জনপদ, সড়ক, সেতু, বাড়িঘর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভেসে যায়। অনেক এলাকায় পুরো গ্রাম কাদা ও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
হিমবাহ ধস থেকেই বন্যার সূত্রপাত
প্রথম দিকে তিব্বত অঞ্চলে একটি ভূমিকম্পের পর বন্যার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, উচ্চভূমির একটি হিমবাহের অংশ ধসে পড়ে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি নদীতে গিয়ে পড়ার পর ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি হয়। এই প্রবল স্রোত দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে।
নেপালে বুধবার রাতে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। একই সময়ে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং এলাকায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬০ হলেও পরবর্তী উদ্ধারকাজে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে।

নিখোঁজ শত শত বিদেশি
নেপাল পর্যটন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জন রয়েছেন। অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে ছিলেন।
তিব্বতের গিরং কাউন্টিতেও বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চল মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে।

যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো বিপর্যস্ত
বন্যার পানিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। (Prothom Alo)
নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারসহ উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে বিমান ও স্থলপথে অভিযান চলছে। তবে ধ্বংস হওয়া সড়ক ও সেতুর কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। (AP News)

দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা
উজানে নদীর গতিপথে ধস ও বরফ-পাথরের স্তূপ জমে থাকায় নতুন করে পানির চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে নেপালের কয়েকটি নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে হিমবাহ ধস, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি হঠাৎ নেমে আসা এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই ভয়াবহ দুর্যোগে গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সরকারের সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে। এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা



