কবিতা সাহিত্য

সুবোধ তুই পালিয়ে যা || পরিতোষ হালদার

শেয়ার করুন:

১. 
যেতে যেত দেখ—গাছ তার ছায়া হারিয়েছে, শ্রমিক হারিয়েছে পেশি, শিশুরা ভিক্ষা করছে শৈশব।
এবার পকেট থেকে বের করে আন—ভাঙা স্বপ্ন, কিছু শব্দ আর একটি অসমাপ্ত বিপ্লব।

যেখানে পায়ের ছাপ মুছে গেলে প্রেসগুলো ফতোয়া ছাপতে শুরু করে। যার পাতায় পাতায় তোর অজস্র কাহন।
অজস্র আর্শিওয়ালা পাখিদের মুখস্ত করায় উড়ালবিদ্যা, যাতে ডানার সাথে সেলাই করে দিতে পারে মানুষের নাম ও অতীত, যা কেউ পড়তে চায় না।

তবু কে যেন ঘাসের ‘পরে সবুজ নৈঃশব্দ্য আঁকে—সাদা-কালো হেমন্তরেখা।

সুবোধ তুই পালিয়ে যা…

শরীরে জমে থাকা যে হিম, আগুন দেখে দূরে যেতে চায়,
তাকে বলিস—

ছাইয়ের কালিতেও একদিন সময় লেখা হবে।

 

২.
সুবোধ তুই পালিয়ে যা…

দেখ, সোডিয়াম লাইটগুলো পেনশনভোগী বৃদ্ধের মতো কাঁপতে কাঁপতে ঝোলে, তবু দেয়ালে ঝরে পড়ে কৃত্রিম রং। শিশুদের মাঝে যে বেশি অন্ধকার, চাঁদ তার পকেটে আসে।

জংধরা প্রেমিকেরা চিৎকার করে—তোর ভাগ্যে কিছু নেইরে সুবোধ; তুই একটা খাঁচা, একটি রেসের ঘোড়া।

তৃষ্ণাও নিলামে ওঠে, অথচ শহরের ড্রেন দিয়ে বইছে কোকাকোলা আর সস্তায় সেল হওয়া আবেগ।

সুবোধ তোর ভালোবাসা আছে, তাই পালাতে জানিস,
তুই একা তাই পালিয়ে যা।
তুই একটি নাম—

অজস্র সর্বনামের মতো পালিয়ে পালিয়ে ফিরে আসার সাহস যোগা।

 

৩.
সব ঘড়ি যেদিন থেমে যাবে বারোটা বাইশে; সে দিনও চা ফুরাবে, রোদভাঙা ছায়া যেতে যেতে বলে যাবে—

সুবোধ তুই পালিয়ে যা…

এ শহর জেনে গেছে কোথায় কে জেগে থাকে, কোন গলিতে তোর প্রেম নত হয়ে আসে। কোন ধাবা থেকে ডালভাত খেয়ে হেঁটে যাও উৎভ্রান্তের মতো।

এবার আলগোছে খুলে ফেল জামা, পরিচয় আর মিছিলের প্রতিশ্রুতি।
ব্যাগে ভরে নে একটা ছবি, হতাশা একটুখানি আকাশ
আর—
ভুলে থাকতে চাওয়া সমস্ত স্মৃতি।

তুইতো জানো পালানো মানে অন্য এক খাঁচার দিকে হাঁটা।
তবু যা, যেখানে কেউ তোকে চেনে না— না মানুষ, না প্রেম, না কোনো বিপ্লব।

পালিয়ে যা সুবোধ—এবার নিজের জন্য হলেও পালা।

 

৪.
অথচ কে যেন পেছনে ডাকে—সুবোধ তুই পালিয়ে যা।
কোনো আদেশ, স্বপ্ন অথবা ব্রেকিং-নিউজ।

সেই মুহূর্তে সমস্ত শহর এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে যায়—একটি ফড়িং উড়ে এসে বলে- কি লাভ সুবোধ, চ্যানেলগুলো পালানোর দৃশ্যটাও টেলিকাস্ট করে দেবে।

তোর খাঁচার সূর্ষ আর কোনো আলো ছড়ায় না, এখন সে জংধরা দুই টাকার কয়েন।
রাস্তার ট্র্যাফিক লাইট হঠাৎ লাল রঙের মিথ্যা জ্বালায়—তোর পালানো তাই একস্বপ্নে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, মোটা দাগের দূরন্ত রেস, নাকি বিলবোর্ডে লেগে থাকা সেই বিজ্ঞাপন—

মৃত্যু নেবে মৃত্যু…

তবু তুই যা, মৃত্যু তোকে ছুঁতে না পারে। যেন জীবন আরেক বদল দেখায়। শহরের মায়া ছিঁড়ে সেইখানে যা,

যেখানে রোদের কোনো লোগো থাকে না।

 

৫.
গলির মুখে যে-মহিলা ডালপুরি ভাজে, তার কড়াইয়ের তেলে ফুটে ওঠে তোর শৈশবের ছবি।
কোথায় লুকাবি সুবোধ…

দৃশ্য থেকে খসে পড়া তিনটি কাচের পাখি, যারা শহরের কফিশপে রেখে আসে বিভ্রান্তির ধোঁয়া।
প্রতি চুমুক যেখানে চুষে নেয় তরল আগুন।

যে পথ দিয়ে হাঁটো, সে এক আস্ত তিমি মাছের পিঠ—
ভাঙা জুতোর নীচে মুচড়ে ওঠে সেই সংবাদ শিরোনাম—
সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না।

যে নারী তোকে শেষবার চুমু খেয়েছিল, তার ঠোঁট এখন পুরানো কোনো লাইব্রেরির ক্যাটালগ কার্ড।
যেখানে অজস্র ঘুম কাত হয়ে আছে।

পালিয়ে যা সুবোধ…

নতুবা কবিতার তৃতীয় চরণে এসে তুই হয়তো বদলে যাবি—
শব্দহীন কোনো কমার বিরামে।


পরিতোষ হালদার। কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার আন্ধারমানিক গ্রামে। পেশায় সহকারী অধ্যাপক, সরকারি মুকসুদপুর কলেজ, গোপালগঞ্জ (অবসরপ্রাপ্ত)। পরিতোষ হালদারের প্রকাশিত গ্রন্থ অনেক। কবিতাবই কুড়িটিরও অধিক, উপন্যাস দুইটি, বেরিয়েছে কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *