- ১৬ মাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির ৮ প্রাণহানি, শোক ও উদ্বেগে প্রবাসীরা
স্বপ্নের দেশে নতুন জীবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তাঁরা। কেউ এসেছিলেন পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাতে, কেউ উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে, আবার কেউ স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সহিংসতা ও অপরাধের নির্মম বাস্তবতায় থেমে গেছে তাঁদের জীবনযুদ্ধ।
গত প্রায় ১৬ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্তত আটটি প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক ও উদ্বেগ। নিহতদের প্রত্যেকেরই ছিল নিজস্ব স্বপ্ন, একটি পরিবার এবং অসংখ্য আপনজন। তাঁদের অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন
নিলুফা ইয়াসমিন — ফ্লোরিডা
প্রবাসী বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট মায়ার্স শহরে ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে নিহত হন।
মনিকা ইসলাম — ফ্লোরিডা
মনিকা ইসলাম ২০২৫ সালের ২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিহত হন।
ইউসুফ রাজু — নিউইয়র্ক
বাংলাদেশি প্রবাসী ইউসুফ রাজু যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন। স্থানীয় সময় শনিবার দিবাগত রাত বা রোববার ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে।
দিদারুল ইসলাম — নিউইয়র্ক
বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের পার্ক অ্যাভিনিউ এলাকায় এক বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন।
জামিল আহমেদ লিমন — ফ্লোরিডা
বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হন এবং পরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। পরবর্তীতে ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার ট্যাম্পা এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি — ফ্লোরিডা
বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হন। পরে ২৬ এপ্রিল তাঁর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শাহেদ রানা হোসেন — টেনেসি
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট ভোরে একটি গ্যাস স্টেশনে সশস্ত্র ডাকাতের গুলিতে শাহেদ রানা হোসেন নিহত হন।
মো. মাহফুজুল হক — পেনসিলভানিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় খাবার ডেলিভারির সময় ২০২৬ সালের ৭ জুলাই, মঙ্গলবার রাতে দুর্বৃত্তের গুলিতে বাংলাদেশি প্রবাসী মো. মাহফুজুল হক নিহত হন।
শোকের সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ
প্রতিটি মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এসেছে শোকের আবহ। প্রবাসের মাটিতে ব্যক্তিগত ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কর্মজীবী, রাতের পালায় কাজ করা প্রবাসী, তরুণ শিক্ষার্থী এবং নতুন অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কমিউনিটির সদস্যরা।
স্বজনদের কাছে তাঁরা শুধু নিহত ব্যক্তির নাম নন। কেউ ছিলেন আদরের সন্তান, কেউ ছিলেন বাবা বা মা, কেউ ভাই কিংবা বোন। আবার কেউ ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং স্বপ্নের প্রধান ভরসা। তাঁদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে অসংখ্য পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা; স্বজনদের জীবনে থেকে গেছে আজীবনের শূন্যতা।
কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য বিনিময়, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সতর্কতা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে কমিউনিটির সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
আমরা শোকাহত, আমরা স্মরণ করি, আমরা একসঙ্গে আছি
স্বপ্নের দেশে জীবন হারানো এই আট বাংলাদেশির স্মৃতি প্রবাসী কমিউনিটির হৃদয়ে বেঁচে থাকুক। তাঁদের স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং অসমাপ্ত পথচলা আমাদের আরও সচেতন, মানবিক ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাক।
স্বপ্নের সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন তাঁরা। ফিরে যাওয়ার কথা ছিল সাফল্যের গল্প নিয়ে। কিন্তু অনেকেরই ফেরা হলো না—ফিরলেন শুধু নিথর দেহ হয়ে। তাঁদের অকালপ্রয়াণের বেদনা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে পরিবার, স্বজন এবং যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি।
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা


