গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর, রবিবার ছিল বিশ্ব নদী দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার বিশ্বজুড়ে নদীর গুরুত্ব, নদী রক্ষা এবং নদীসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়।
হিমালয়ের বরফগলা পানি, বর্ষার প্রবাহ ও পলিবাহিত জলধারায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি মূলত নদীনির্ভর। গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও সুরমা-মেঘনা—এই বৃহৎ নদী ব্যবস্থাগুলো বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ বদ্বীপ ও প্লাবনভূমি গড়ে তুলেছে। নদী তাই শুধু পানির প্রবাহ নয়; বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নদীর সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে নদীর নামেও যেন ফুটে উঠেছে এ দেশের মানুষের জীবন, কল্পনা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। কোথাও ফুলকুমারী, কোথাও ফকিরনী; কোথাও খেপা, পাগলা, লেংগা, মাথাভাঙ্গা। আছে চিকনাই, পেটকি, ধলা, কালা। একদিকে মধুমতি, অন্যদিকে বিষখালী। আছে মিরগি, বোকা, বাউলাই, ঘুমানি, ভাবনা—কত বিচিত্র নাম!

আবার নামের ভেতর ইতিহাস ও পুরাণেরও ছাপ রয়েছে—পাণ্ডব, বিষ্ণু, হরি, নারদ, হরিহর, মানস, রামচণ্ডী, ভুবনেশ্বর, গদাই, নিতাই, শিব, ধলেশ্বরী, গভেশ্বরী, কাগেশ্বরী, সোমেশ্বরী, নাগেশ্বরী, যমুনেশ্বরী, ভাটেশ্বরী ও মুক্তেশ্বরী।
ইতিহাসও যেন নদীর নামের সঙ্গে মিশে আছে। আড়িয়াল খাঁ, জলকদর খাঁ, মিনহাজ, মুসা খান, ইসদার খান—এসব নাম আমাদের নদীপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অতীতের নানা অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
নদীর নামের মধ্যেও আছে বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনচিত্র। পুটিমারী, সিংগিমারী, শোলমারী, চিতলমারী, ইলিশমারী, সাপমারা, খাসিমারা, মারামারি, ঘোড়ামারা—নামগুলো যেন একেকটি ছোট গল্প। আছে কাঁচামাটিয়া ও রাঙামাটিয়া, সুই ও সুতা, শুক ও সারী। প্রাণী-পাখির নামেও নদী পরিচিত—বগী, চন্দনা, টিয়াখালী, পায়রা, ডাহুক, কোকিল, ময়ূর। আছে চোরখাই ও ডাকাতিয়া।
একই নামে বহু নদীর অস্তিত্বও বাংলাদেশের নদীভূগোলের বৈচিত্র্য তুলে ধরে। যেমন ইছামতী নামেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক নদী রয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৫ সালে নতুন করে বাংলাদেশের নদ-নদীর তালিকা প্রকাশ করেছে—যা প্রমাণ করে দেশের নদী ব্যবস্থার তালিকা ও পরিচিতি নির্ধারণ এখনও একটি চলমান ও জটিল কাজ।

তবে নদীর নাম যতই বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর হোক, বাস্তবতা আজ উদ্বেগজনক। দেশের বহু নদী দখল, দূষণ, নাব্যতা সংকট, অবৈধ বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও বিভিন্ন নদীতে দখল, দূষণ ও নাব্যতা সমস্যার বিষয় উঠে এসেছে।
সরকারি পরিবেশগত মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, শিল্পায়ন, নগরায়ণ, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন ও শিল্পবর্জ্য নদী ও জলাধারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বড় শহর ও নগরকেন্দ্রগুলোর আশপাশের অনেক নদীর পানির মান উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং উজানের প্রবাহে পরিবর্তন বাংলাদেশের বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে লবণাক্ততা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে পানীয় জল, কৃষি ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর।

নদী রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তিও রয়েছে। ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত তুরাগ নদী মামলার রায়ে দেশের সব নদীকে আইনগত সত্তা বা legal person হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা উঠে আসে। একই সঙ্গে আদালত নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদকে জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই বিশ্ব নদী দিবসে প্রশ্ন শুধু কতটি নদী আছে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—যে নদীগুলো আমাদের ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে দিয়েছে, সেগুলো আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা নিরাপদ রাখতে পারছি?
নদীকে শুধু মানচিত্রে বাঁচিয়ে রাখলেই হবে না; তার স্বাভাবিক প্রবাহ, নাব্যতা, জীববৈচিত্র্য ও তীরের মানুষের জীবন-জীবিকাও রক্ষা করতে হবে। দখল ও দূষণ বন্ধ করার পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ নিশ্চিত করা, অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামোর প্রভাব বিবেচনা করা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি।

কারণ নদী কোনো বিচ্ছিন্ন জলধারা নয়—নদীই বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ। নদীর সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের মতোই পুরোনো।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমরা নদীরই সন্তান। নদীর সংখ্যা নিয়ে হিসাবের ভিন্নতা থাকতে পারে—তিন হাজার, সাতশো কিংবা অন্য কোনো সংখ্যা। কিন্তু একটি সত্যে কোনো বিভেদ নেই: নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে; নদীর প্রবাহ বাঁচলে বাঁচবে মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
আশরাফুল ইসলাম আরিফ : অন্যান্য রচনা
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা



