বিনোদন

‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’ : প্রবাসের মঞ্চে নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

শেয়ার করুন:

—রাজিয়া নাজমীর গল্পে সমাজের অদৃশ্য কাঁটাতার
—রাফিয়া খান নিশির অভিনয়ে মানবিক আর্তি

নিজস্ব প্রতিনিধি

মঞ্চজুড়ে আলো, সামনে দর্শক। সেই আলোর ভেতর ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এমন এক জীবন—যেখানে ভালোবাসা, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাকে ঘিরে থাকে সমাজের গভীর অন্যায়, বৈষম্য ও নির্মম বাস্তবতা।

এই বাস্তবতাকেই শিল্পের ভাষায় মঞ্চে তুলে ধরেছে রাজিয়া নাজমী রচিত ‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’। ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের হিকসভিলের লেভিটাউন হলে অনুষ্ঠিত শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলা ২০২৬-এর সমাপনী দিনে নাটকটি ছিল অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা। নাট্য উপস্থাপনাটির চিত্রনাট্য ও নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।

রাজিয়া নাজমীর ‘চৌকাঠের বাইরে’ গল্পগ্রন্থের একটি গল্প নিয়ে নির্মিত এই প্রযোজনা শুধু একটি কাহিনি বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে দর্শকের সামনে কিছু প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

কাঁটাতার ও গোলাপের প্রতীকী দ্বন্দ্ব

নাটকের নামেই যেন এর অন্তর্নিহিত বক্তব্যের ইঙ্গিত রয়েছে। কাঁটাতার এখানে বিভাজন, বাধা, বন্দিত্ব ও নির্মমতার প্রতীক; আর লাল গোলাপ ভালোবাসা, সৌন্দর্য, স্বপ্ন ও মানবিকতার।

দুটি বিপরীত প্রতীকের পাশাপাশি অবস্থান মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও আকাঙ্ক্ষার পথে তৈরি সামাজিক সীমারেখার বিষয়টি স্পষ্ট করে। ব্যক্তিমানুষ যখন এসব বাধার মুখোমুখি হয়, তখন তার অবস্থান কোথায়—নাটকটি দর্শককে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

রাজিয়া নাজমীর লেখার শক্তি এখানেই। তিনি সরাসরি বক্তব্য চাপিয়ে না দিয়ে চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো তুলে ধরেছেন। ফলে মঞ্চের কাহিনি একসময় দর্শকের পরিচিত জীবনের সঙ্গেও মিশে যায়।

সমাজের সব অসংগতি একজন লেখক একা পরিবর্তন করতে পারেন না। তবে সেগুলোকে দৃশ্যমান করা, মানুষের বেদনা ও প্রশ্নকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করা এবং দর্শককে ভাবতে বাধ্য করা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নাটকটি সেই প্রচেষ্টারই একটি উদাহরণ।

মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নির্দেশনায় নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শফিউল আলম, আহছান উল্লাহ, সুলতানা খানম ও রাফিয়া খান নিশি।

আধাঘণ্টার একক অভিনয়ে রাফিয়া খান নিশি

প্রযোজনাটির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাফিয়া খান নিশির অভিনয়। প্রায় ৩০ মিনিটের একক অভিনয়ে তিনি মঞ্চের কেন্দ্র ধরে একটি চরিত্রের আবেগ, বেদনা, প্রতিবাদ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তুলে ধরেন।

একক অভিনয়ে দীর্ঘ সময় দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা যেমন কঠিন, তেমনি চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিকে অতিনাটকীয় না করে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাও বড় চ্যালেঞ্জ। রাফিয়া খান নিশি সংলাপের পাশাপাশি মুখের অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও নীরবতার সূক্ষ্ম ব্যবহারে চরিত্রটির আবেগ ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছেন। কখনো তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, কখনো অসহায়ত্ব, আবার কখনো এমন নীরবতা, যা সংলাপের চেয়েও বেশি কিছু বলে যায়। একক উপস্থিতিতে দীর্ঘ দৃশ্যকে প্রাণবন্ত রাখার এই সক্ষমতা নাটকের আবেগকে ধরে রাখে এবং দর্শককে চরিত্রটির সংকটের আরও কাছে নিয়ে যায়।

নাটক শেষে দর্শকদের করতালি তাঁর অভিনয়ের প্রতি তাৎক্ষণিক দর্শক-প্রতিক্রিয়ারও প্রকাশ ঘটায়।

নির্দেশনা ও সম্মিলিত প্রয়াস

মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নির্দেশনায় গল্পের আবেগ ও সামাজিক বক্তব্যকে মঞ্চে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে নাটকটি শুধু বক্তব্যনির্ভর হয়ে ওঠেনি; চরিত্রগুলোর আবেগ ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই কাহিনি এগিয়েছে।

হাসিব হোসেনের আবহ শব্দ নিয়ন্ত্রণ, মঞ্চসজ্জা ও কারিগরি পরিবেশনাও নাটকের আবহ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। সব মিলিয়ে এটি লেখক, নির্দেশক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি একটি মঞ্চপ্রযোজনা।

তিন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্বকে উৎসর্গ

বাংলা নাট্যাঙ্গনের তিন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, মুস্তাফা মনোয়ার ও জামাল উদ্দিন হোসেনকে উৎসর্গ করা হয় এবারের শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলা।

লং আইল্যান্ডের লেভিটাউন হলে ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এ নাট্য উৎসবে শিল্পাঙ্গনের নিজস্ব প্রযোজনায় চারটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ছিল ‘চন্ডালিকা’, ‘ইমপ্রিজনমেন্ট ৪৬৮২’, ‘আমাদের হালখাতা’ ও ‘শতবর্ষে রক্তকরবী’; আর ২০ সেপ্টেম্বর মঞ্চস্থ হয় ‘নাট্যকোলাজ ‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’ ‘মানুষ’, ‘বেদের মেয়ে’।

দুই দিনের আয়োজনটি তাই শুধু নাট্যপ্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রবাসে বাংলা থিয়েটারের বিভিন্ন ধারা ও প্রজন্মের শিল্পীদের একত্র হওয়ার একটি সাংস্কৃতিক পরিসরও তৈরি করেছে।

প্রবাসে বাংলা থিয়েটারের লড়াই

বিদেশের মাটিতে বাংলা নাটকের আয়োজন সহজ নয়। পেশাগত ও পারিবারিক ব্যস্ততার পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া, শিল্পীদের সময় সমন্বয়, অর্থসংস্থান, মঞ্চ, আলো, শব্দসহ নানা কারিগরি প্রস্তুতি সামলে একটি প্রযোজনা দর্শকের সামনে আনতে হয়।

তারপরও নিউইয়র্কের মতো বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বাংলা নাটকের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। বছরের পর বছর বিভিন্ন নাট্যদল নিজেদের শ্রম ও ভালোবাসায় এই ধারাকে এগিয়ে নিচ্ছে।

শিল্পাঙ্গনের এবারের নাট্যমেলাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এ ধরনের আয়োজন একদিকে প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ধরে রাখে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা নাটকের একটি সাংস্কৃতিক সংযোগ তৈরি করে।


মঞ্চের আলো নিভলেও প্রশ্ন থেকে যায়

একটি নাটকের প্রভাব শুধু পর্দা নামার মুহূর্তের করতালিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু মঞ্চপ্রযোজনা শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে থেকে যায়—চরিত্র, সংলাপ কিংবা কোনো অনুচ্চারিত প্রশ্নের সূত্র ধরে।

‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’ তেমনই একটি মঞ্চ-অভিজ্ঞতা। এখানে কাঁটাতার কেবল একটি লোহার বেড়া নয়; এটি মানুষের তৈরি সামাজিক ও মানসিক বাধার প্রতীক। আর লাল গোলাপ হয়ে ওঠে ভালোবাসা, স্বপ্ন, সৌন্দর্য ও মানবিকতার প্রতিরূপ।

এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই নাটকটি তার বক্তব্য নির্মাণ করেছে। মঞ্চের আলো নিভে দর্শকেরা ফিরে গেছেন নিজেদের জীবনে; কিন্তু নাটকের কিছু দৃশ্য, রাফিয়া খান নিশির অভিনয়ের কিছু মুহূর্ত এবং কিছু প্রশ্ন হয়তো তাদের মনে থেকে গেছে।

প্রবাসের মাটিতে বাংলা নাটকের এই চর্চা শুধু সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে না, মানুষের জীবন ও সমাজকে নতুন করে দেখার সুযোগও তৈরি করে। সেই পথচলায় রাজিয়া নাজমীর গল্পের ‘লাল গোলাপ’ হয়ে উঠতে পারে অদৃশ্য সীমারেখার ভেতরেও মানবিকতার টিকে থাকার এক শিল্পিত প্রতীক।


পড়ুন একই নাট্যমেলা নিয়ে আরেকটি রচনা

বিদেশ-বিভুঁইয়ে বাংলা থিয়েটার : শিল্পাঙ্গনের নবম নাট্যোৎসবের পর্দা নামল

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *