বিনোদন

বিদেশ-বিভুঁইয়ে বাংলা থিয়েটার : শিল্পাঙ্গনের নবম নাট্যোৎসবের পর্দা নামল

শেয়ার করুন:

—তিন বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্বকে উৎসর্গ
—শেষ দিনে একাধিক নাটক

বিদেশ-বিভুঁইয়ে বসে বাংলা থিয়েটার করা সহজ নয়। প্রবাসের ব্যস্ত জীবন, অর্থসংকট, নিয়মিত মহড়া, শিল্পীদের একত্র করা, মঞ্চ ও কারিগরি প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে প্রতিটি আয়োজনের পেছনে থাকে শ্রম ও দায়বদ্ধতা। তবু থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে বারবার মঞ্চে ফিরিয়ে আনে। কোনো না কোনোভাবে আয়োজনের পথও তৈরি হয়ে যায়।

এই ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন দেখা গেল লং আইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত শিল্পাঙ্গন নাট্যমেলা ২০২৬-এর নবম নাট্য উৎসবে। নিউইয়র্কের হিকসভিলের Levittown Hall-এ তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের শেষ দিন ছিল গত রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর।

ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবেশে থেকেও বাংলা মঞ্চনাটকের চর্চা অব্যাহত রাখার প্রয়াসে আয়োজিত এবারের উৎসব উৎসর্গ করা হয় বাংলা নাট্যাঙ্গনের তিন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, মুস্তাফা মনোয়ার ও জামাল উদ্দিন হোসেনকে। দু’দিনের এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন লেখক আহমেদ মাযহার এবং রবিবারের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন নাট্যকার ও অভিনেতা খাইরুল ইসলাম পাখি।

উৎসবের শেষ দিনে মঞ্চস্থ হয় একাধিক নাট্যপ্রযোজনা। এর মধ্যে ছিল বাংলা থিয়েটার প্রযোজিত মামুনুর রশীদের ‘মানুষ’, নির্দেশনায় শিরীন বকুল; ‘নাট্যকোলাজ’, গ্রন্থনায় গোলাম সরোয়ার হারুন এবং নির্দেশনায় গার্গী মুখার্জি ও গোলাম সরোয়ার হারুন; এবং পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের ‘বেদের মেয়ে’, নির্দেশনায় মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।

এছাড়া মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের রচনা ও নির্দেশনায় ‘আমাদের হালখাতা’ শনিবার ও রবিবার—দুই দিন মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির মঞ্চায়ন দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।

শেষ দিনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছিল ‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’। রাজিয়া নাজমীর লেখা গল্প অবলম্বনে নির্মিত নাটকটি গত রবিবার প্রথমবারের মতো মঞ্চস্থ হয়। নির্দেশনায় ছিলেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। অভিনয় করেছেন শফিউল আলম, আহছান উল্লাহ, সুলতানা খান এবং নাটকের মূল চরিত্রে রাফিয়া খান নিশি।

নাটকটিতে সমাজে ঘটে চলা এক নির্মম বাস্তবতাকে নাটকের ভাষায় সরাসরি মঞ্চে তুলে ধরা হয়েছে। সমাজকে একজন লেখক একা বদলে দিতে পারেন না; তবে সমাজের অসংগতির দিকে আঙুল তুলে সেগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলা তাঁর কাজেরই অংশ। কথাকার রাজিয়া নাজমী ‘কাঁটাতারে বিঁধে আছে লাল গোলাপ’-এর মধ্য দিয়ে সেই বাস্তবতার দিকেই দর্শকের দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করেছেন।

মূল চরিত্রে রাফিয়া খান নিশির অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

শিল্পাঙ্গনের নাট্য উৎসবে নিউইয়র্কের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক এবং বিভিন্ন নাট্যদলের নাট্যকার ও নাট্যশিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী রেখা আহমেদ ও লুৎফুন নাহার লতা, সাংবাদিক মানজুর আহমেদ এবং নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাঙালী-এর সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ।

ফিলাডেলফিয়া পত্রিকার পক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা, কবি ও নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীর এবং কবি আহমদ সায়েম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন কবি কাউসারি মালিক রোজী, নার্গিস পারভিন, সামসুন মনিরা কস্তরি এবং BACF TV-এর মাসুদুল হাসান সরোয়ার ড্যানিয়াল।

নাটক শেষে বক্তব্যে রাজিয়া নাজমী সংশ্লিষ্ট শিল্পী, কলাকুশলী ও দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

তিন দিনের আয়োজন শেষে পর্দা নামল শিল্পাঙ্গনের নবম নাট্য উৎসবের। দেশ থেকে বহু দূরে বাংলা ভাষায় নাটক লেখা হচ্ছে, মহড়া চলছে, মঞ্চে আলো জ্বলছে—প্রবাসে বাংলা থিয়েটারের জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে।

অর্থ ও আয়োজনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শেষ পর্যন্ত মঞ্চের আলো জ্বালিয়ে রাখে মানুষের শিল্পপ্রেম।

শেয়ার করুন:

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *