সমাজ

বীরকন্যা প্রীতিলতা : ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক || জোহরা খাতুন কলি

শেয়ার করুন:

ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬। উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সাহসী নারী বিপ্লবী, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস। মাত্র ২১ বছর বয়সে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বিপ্লবী আজও বাংলার ইতিহাসে সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছেন।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘রাণী’; বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তিনি ‘ফুলতারা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও দৃঢ়চেতা। চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ঢাকার ইডেন কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর স্নাতক ডিগ্রি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের কারণে আটকে থাকলেও মৃত্যুর বহু বছর পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মরণোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে।

শিক্ষাজীবন শেষে প্রীতিলতা চট্টগ্রামের নন্দনকানন অপরাচরণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে কেবল শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তিনি মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠনে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে তিনি বিপ্লবীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

 

পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে ঐতিহাসিক অভিযান

১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত ইউরোপীয়ান ক্লাব ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বৈষম্যের একটি প্রতীক। ক্লাবটির প্রবেশপথে তৎকালীন বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ‘Dogs and Indians Not Allowed’ লেখা একটি সাইনবোর্ড থাকার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্লাবটিতে হামলার পরিকল্পনা করেন বিপ্লবী নেতা মাস্টারদা সূর্যসেন। প্রথমে কল্পনা দত্তের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযানের কয়েক দিন আগে তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে সশস্ত্র অভিযান চালান। অভিযানের সময় প্রীতিলতা পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।

অভিযানের একপর্যায়ে ব্রিটিশদের পাল্টা গুলিতে প্রীতিলতা আহত হন। আহত অবস্থায়ও তিনি সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যেতে নির্দেশ দেন। পরে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কায় তিনি সঙ্গে থাকা পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্রহণ করেন। সরকারি ঐতিহাসিক নথিতে তাঁর মৃত্যুর সময় ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ রাত ১০টা ৪৫ মিনিট উল্লেখ করা হয়েছে।

 

নারীর অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত

প্রীতিলতার আত্মাহুতি শুধু একটি বিপ্লবী অভিযানের পরিণতি ছিল না; এটি ছিল তৎকালীন সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও একটি শক্তিশালী বার্তা। তিনি দেখিয়েছিলেন, দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল পুরুষের দায়িত্ব নয়—নারীরাও একইভাবে সাহস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাঁর সমসাময়িক কল্পনা দত্তসহ আরও অনেক নারী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রীতিলতার নেতৃত্বে পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে অভিযান নারীদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

 

ইতিহাসে অমর প্রীতিলতা

প্রীতিলতার জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ২১ বছরের জীবনে তিনি শিক্ষা, শিক্ষকতা এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ড—তিনটি ক্ষেত্রেই নিজের দৃঢ়তা ও মেধার পরিচয় দেন। তাঁর আত্মাহুতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নারীর সাহস, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক ভূমিকার একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

আজ, তাঁর ৯৪তম আত্মাহুতি দিবসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে স্মরণ করা নয়; বরং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর সময়ের সংগ্রাম, নারীর অংশগ্রহণ এবং বৃহত্তর আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর সেই ঐতিহাসিক স্থান আজও প্রীতিলতার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে স্থাপিত হয়েছে তাঁর ভাস্কর্যও।

সময়ের ব্যবধানে ৯৪ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নাম মুছে যায়নি। ইতিহাসের পাতায় তাঁর স্থান আজও উজ্জ্বল—একজন তরুণী, যিনি নিজের জীবনকে ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের চেয়ে দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নের কাছে উৎসর্গ করেছিলেন।


শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *