
৮. বাংলাকবিতার নিকোটিন
সিগারেট ধরাইনি আজ তিনদিন। কিন্তু বুকের ভেতর ধোঁয়া। ডাক্তার বলেছে—নিকোটিন ছাড়ো। আর পাড়ার ছেলেরা বলে—কবিতা ছাড়ো। আমি হাসি। বলি- একটা ছাড়লে আরেকটা আপনাআপনি ছেড়ে যাবে। আমার নামে কোনো বই নাই। পত্রিকায় দুই লাইন ছাপা হয়েছিল ২০১১ সালে। তারপর থেকে লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকও চেনে না। ব্যাংকব্যালেন্স শূন্য। পকেটে বাস ভাড়া থাকে না। তবু পকেটে সবসময় একটা কলম আর ভাঁজ-করা কাগজ।
লোকে বলে হতভাগা। হতভাগাই তো। ভোর ৫টায় উঠে টিউশনি। ৮টা থেকে ৫টা অফিসের ফটোকপির দোকান। রাত ১০টায় ঘরে ফিরে স্ত্রীর মুখে হিসাবের খাতা। চাল নাই। গ্যাসের বিল বাকি। মেয়েটার স্কুলের বেতন। এই সবের ফাঁকে আমি কবিতা লিখি। কেউ পড়ে না। তবু লিখি।
‘হতভাগা! তোর ফুসফুস ভরা বাংলাকবিতার নিকোটিন’—বন্ধু আলফ্রেড একদিন আড্ডায় বলেছিল। গ্লাস ঠুকতে ঠুকতে। ও এখন কোম্পানির ম্যানেজার। গাড়ি আছে। ফ্ল্যাট আছে। আমাকে দেখে ওর মায়া হয়। বলে—ছাড় এইসব। দুই পয়সা ইনকাম কর। আমি বলি—নিকোটিন ছাড়া যায়। কবিতা ছাড়া যায় না রে!
কারণ কবিতা আমার নিকোটিন। সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিলে প্রথম লাইন আসে।
অফিসে ফটোকপি মেশিনের গরম কাগজের গন্ধে একটা চিত্রকল্প জন্মায়। রাতে কারেন্ট গেলে মোমের আলোয় শব্দরা লাইন ধরে দাঁড়ায়। খিদে পেলে পেট না, খাতা ভরে।
ট্র্যাজেডি? আছে। ট্র্যাজেডি হলো—যার জন্য লিখি সে পড়ে না। বউ বলে- কবিতা বেচে চাল আসবে?
মেয়ে বলে—বাবা, তুমি ইউটিউবার হও না কেন?
বাবা ফোনে বলে—চাকরি ছেড়ে দে। গ্রামে জমি দেখি।
আর আমি? আমি রাত ১২টার পর জানালা খুলি। নিচে সরলরেখার মতো রাস্তা। দুই পাশে গাছ নাই। শুধু ল্যাম্পপোস্ট। তবু ওই রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবি, শব্দ দিয়ে যদি একটা জামগাছ লাগানো যেত। যার ছায় দশবছর পরের কোনো হতভাগা বসে একটু জিরাবে।
টাকা নাই। নাম নাই। পুরস্কার নাই। আছে শুধু এই নিকোটিন। বাংলাকবিতার নিকোটিন। যা ফুসফুসে জমে। কাশি হয়। রক্ত আসে। তবু ছাড়া যায় না। একবার এক সম্পাদক বলেছিল—তোমার কবিতায় ক্ষুধা আছে। কিন্তু বাজার নাই।
আমি বলেছিলাম—বাজার না থাক, ক্ষুধা থাক।
আজও লিখি। খাতার পাতা শেষ হলে পুরনো বিলের পেছনে লিখি। কলমের কালি শেষ হলে পেন্সিলে লিখি। পেন্সিলও না থাকলে আঙুল দিয়ে টেবিলে লিখি। তারপর মুছে ফেলি। কারণ মুছে ফেললেও শব্দটা থেকে যায়। বুকের ভেতর। নিকোটিনের মতো।
স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।



