সমাজ

হামে মৃত্যু ১১০৪, দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি

হামে মৃত্যু ১১০৪, দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি
শেয়ার করুন:

বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১০৪ হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, দেশে হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা যায়নি। রোগটি প্রায় নির্মূলের পথে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টিকাদানের ঘাটতি, চিকিৎসায় গাফিলতি এবং গণটিকাদান কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।

হামে সন্তান হারানো পরিবারগুলোর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। বিয়ের প্রায় ১১ বছর পর আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া ফাইয়াজ হাসান তাজিম ৮ মাস ১৮ দিন বয়সে গত ২২ এপ্রিল হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার মা ফারজানা ইসলাম সন্তান হারানোর পরও জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, হামে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়ালেও এ নিয়ে কথা বলে কোনো লাভ হচ্ছে না—সন্তানহারা মা-বাবারা বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

পার্বত্য জেলা বান্দরবানে খুমি জাতিগোষ্ঠীর তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির দুই সন্তানও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। চার বছর বয়সী প্রেলং খুমি ও সাত বছর বয়সী খ্রেতং খুমিকে রুমা উপজেলার লেংটংপাড়ায় পাশাপাশি দুটি কবরে সমাহিত করা হয়। আক্রান্ত আরও দুই সন্তান—১১ বছরের পথাং এউং ও সাত মাস বয়সী লিংথং এ খুমি—জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং মার্চে তা ব্যাপক আকার নেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৫১০ জন। হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ৩৯২ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ১১ হাজার ৯০২। এর বিপরীতে ২০২৫ সালে হাম রোগী ছিল ১৩২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক উপাত্ত অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে হাম বা হামের উপসর্গের ৪২ হাজার ১৭৪ রোগী পাওয়া গেছে, যা ওই সময়ে বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ভারতে ২৬ হাজার ৬০৭, ইয়েমেনে ১৪ হাজার ৫২১ এবং মেক্সিকোতে ১২ হাজার ৪৯৫ রোগী শনাক্ত হয়।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন এই পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে দায়ীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে অবহেলা হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের সময়ে চিকিৎসা ও টিকা—দুই ক্ষেত্রেই গাফিলতি দেখা গেছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ মনে করেন, হাম প্রতিরোধে সরকার কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতি মারাত্মক হওয়ার সময় হামকে মহামারি ঘোষণা করা হলে কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায়ে বাড়তি নজর দেওয়া যেত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। তিনি দায় স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ বিবেচনার কথাও বলেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০-২১ সালের পর বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন আর হয়নি। নিয়মিত টিকাদানের আওতাও কমে ২০২৫ সালে ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হলেও হিসাবের গরমিলে ৪৬ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। টিকাদানের চার মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু না কমায় জনস্বাস্থ্যবিদেরা এর কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *