যুক্তরাষ্ট্র থেকে আফ্রিকার এমন দেশগুলোতে অভিবাসীদের পাঠানো হচ্ছে, যেসব দেশের তারা নাগরিক নন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, এই প্রক্রিয়া বেআইনি এবং অভিবাসন নিরুৎসাহিত করতে মানুষের ভোগান্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যের বরাত দিয়ে এই হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের ভাষ্য, এসব অভিবাসীর ‘অনেকেই, সম্ভবত অধিকাংশই’ নিজেদের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যদিও সেখানে তাদের জন্য ক্ষতি বা নির্যাতনের ঝুঁকি থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) বলেছে, তৃতীয় কোনো দেশে বহিষ্কার করা জননিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের’ যুক্তরাষ্ট্রের রাজপথ থেকে সরানো হয়। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় ছিল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ।
এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, আফ্রিকার কয়েকটি দেশ বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের নির্বিচারে আটক করেছে অথবা তাদের নিজ দেশে পাঠিয়েছে। এতে নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ কিংবা জীবন ও স্বাধীনতার জন্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এসওয়াতিনি, ঘানা ও দক্ষিণ সুদানে পাঠানো ব্যক্তিদের নির্বিচারে আটক করা হয়েছিল এবং আটক অবস্থায় তারা দুর্ব্যবহারের শিকার হন।
ক্যামেরুন, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও ঘানায় পাঠানো কিছু ব্যক্তিকে পরে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ বলছে, যেসব দেশে নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে কাউকে ফেরত না পাঠানোর আন্তর্জাতিক নীতি এতে লঙ্ঘিত হতে পারে।
এসওয়াতিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩২ জন বহিষ্কৃত ব্যক্তিকে গ্রহণ করেছিল। বুধবার দেশটি জানায়, ইয়েমেন, বেলিজ ও লাওসের তিনজন সম্প্রতি ‘স্বেচ্ছায়’ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। দেশটির বক্তব্য, তৃতীয় দেশের নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো ব্যক্তিদের গন্তব্য ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হওয়া কিছু চুক্তি এখনও গোপন।
এইচআরডব্লিউ ছয়টি দেশে থাকা ২৪ জন তৃতীয় দেশের নাগরিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, বহিষ্কারের সময় প্রায় ১৮ ঘণ্টা হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তাদের গন্তব্য সম্পর্কে জানানো হয়নি। অনেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি; পর্যাপ্ত খাবার ও পানিও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ১২ জন এলজিবিটি পরিচয়ের ব্যক্তিকে এমন আফ্রিকান দেশে পাঠানো হয়েছে, যেখানে সমলিঙ্গের সম্পর্ক অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তাদের মধ্যে এমন শরণার্থীও ছিলেন, যারা যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয়ের কারণে নিজ দেশে নিপীড়নের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রে সুরক্ষা পেয়েছিলেন।
কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে এপ্রিলে কলম্বিয়া, পেরু ও ইকুয়েডরের ১৫ জনকে পাঠানো হয়েছিল। এইচআরডব্লিউকে এক মার্কিন আইনজীবী জানান, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ তাদের কেউ সেখানে ছিলেন না; ১১ জন নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। সংস্থাটি বলেছে, সেখানে তাদের অনিশ্চয়তা ও অবস্থার কারণে এই প্রত্যাবর্তন সত্যিই স্বেচ্ছায় হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ৬৫ জনকে গ্রহণ করেছিল এবং তাদের মধ্যে অন্তত দুজনকে দ্রুত নিজ দেশে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, বুরুন্ডি গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত অভিবাসীদের গ্রহণে সম্মত হওয়ার কথা জানিয়েছে।
ডিএইচএস বলেছে, অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গন্তব্য দেশগুলোর কাছ থেকে কূটনৈতিক নিশ্চয়তা নেওয়া হয়। তবে কোনো ব্যক্তি ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) হেফাজতের বাইরে চলে গেলে তার নিরাপত্তার জন্য আইস আর দায়ী নয় বলেও বিভাগটি জানিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত আফ্রিকার দেশগুলোর কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।


