এডিটর'স চয়েস বিজ্ঞান

এআই : মানুষ কি নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতেই বদলে ফেলছে?

শেয়ার করুন:

সম্পাদকীয়


মানুষ চাঁদে গেছে, পরমাণুশক্তি আবিষ্কার করেছে, ইন্টারনেট সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এখন মানুষ এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা শুধু মানুষের তৈরি নির্দেশ পালন করবে না—একদিন হয়তো মানুষের মতো চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও অর্জন করতে পারে। সেই প্রযুক্তির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই।

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি জানি এই যাত্রার শেষ কোথায়?

মাত্র কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছিল প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের আলোচনার বিষয়। এখন এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। কোনো তথ্য জানতে আমরা সার্চ ইঞ্জিনে না গিয়ে এআইকে প্রশ্ন করছি। শিক্ষার্থী এআই দিয়ে পড়াশোনা করছে, কর্মী রিপোর্ট লিখছে, প্রোগ্রামার কোড তৈরি করছে, ব্যবসায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। ছবি, ভিডিও, সংবাদ, বিজ্ঞাপন—সবকিছুতেই এআইয়ের উপস্থিতি বাড়ছে।

অর্থাৎ এআই ভবিষ্যৎ নয়; এআই ইতিমধ্যে বর্তমান।

সম্প্রতি সাবেক ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক গবেষক জ্যাকব কক্সনের কিছু মন্তব্য এই বাস্তবতাকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অত্যন্ত উন্নত এআই একসময় মানবজাতির জন্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে এআই মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও তিনি দিয়েছেন।

এই বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কবে বা আদৌ এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন না। কিন্তু একজন প্রযুক্তি গবেষক যখন নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তখন প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেই হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে শুধু বাইরের সমালোচকরাই কথা বলছেন না। এআই তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রযুক্তি কোম্পানির গবেষক ও নির্বাহীদের মধ্যেও নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর যুক্তি, চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে পড়া যাবে না।

এই অবস্থানও একেবারে অমূলক নয়। এআই এখন শুধু বেসামরিক প্রযুক্তি নয়; অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গবেষণা এবং সামরিক সক্ষমতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—

প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

এআই বন্ধ করা সম্ভব নয়। কোনো একটি দেশ বন্ধ করলেও অন্য দেশ এগিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র থামলে চীন এগোতে পারে, চীন থামলে অন্য কোনো দেশ এগোতে পারে। তাই এআইকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়।

কিন্তু এআইয়ের উন্নয়ন যত দ্রুত হবে, তার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কি একই গতিতে এগোবে?

এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।

 

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে চাকরির বাজারে

এআই নিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংসের আশঙ্কার চেয়েও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো আরও তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হলো—চাকরি থাকবে তো?

এআই ইতিমধ্যে এমন অনেক কাজ করতে পারছে, যেগুলো একসময় শুধু শিক্ষিত মানুষের দক্ষতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। লেখা, অনুবাদ, হিসাব, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন, গ্রাহকসেবা, গবেষণার সহায়তা—এমন অসংখ্য ক্ষেত্রে এআই মানুষের সক্ষমতার বিকল্প বা সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর অর্থ এই নয় যে অল্প কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ বেকার হয়ে যাবে। এমন নির্দিষ্ট দাবি করার মতো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং বাস্তবতা হলো, চাকরির প্রকৃতি বদলাবে।

কিছু কাজ কমে যাবে, কিছু কাজের জন্য কম মানুষ প্রয়োজন হবে, আবার নতুন ধরনের কাজও তৈরি হবে।

কিন্তু বিপদটি অন্য জায়গায়।

যে মানুষটি আজ একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়ে চাকরি করছেন, তিনি যদি আগামীকাল দেখেন তাঁর কাজটি মেশিন আরও দ্রুত ও কম খরচে করতে পারছে—তাহলে তাঁকে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত না থাকলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও কর্মবাজারে চাপে পড়তে পারে।

 

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন—আমরা কি ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করছি, নাকি অতীতের কর্মবাজারের জন্য?

আমরা প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছি। তারা ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। কিন্তু সেই ডিগ্রি অর্জনের পর যে কর্মবাজারে প্রবেশ করবে, সেটি হয়তো আজকের কর্মবাজারের মতো থাকবে না।

তাই শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না। প্রশ্ন করতে হবে—এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থী ১০ বছর পর কী করবে?

শিক্ষার লক্ষ্য শুধু একটি সনদ হওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীকে এমন দক্ষতা দিতে হবে, যা প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করবে।

এআই ব্যবহার করতে পারা, তথ্য যাচাই করতে পারা, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করা, জটিল সমস্যা সমাধান করা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা, নেতৃত্ব দেওয়া—এসব দক্ষতার গুরুত্ব বাড়বে।

আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের এখনই বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

শুধু কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়—আইন, সাংবাদিকতা, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, ব্যাংকিং, প্রশাসন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআইয়ের প্রভাব পড়বে।

 

মানুষ কি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে?

এখানে এসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি সামনে আসে—মানুষের প্রয়োজন কি একদিন ফুরিয়ে যাবে?

এখনই এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। বরং ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রযুক্তি মানুষের কাজের ধরন পরিবর্তন করে; মানুষকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় করে দেয়—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

তবে এআই আগের প্রযুক্তিগুলোর তুলনায় ভিন্ন একটি বৈশিষ্ট্য বহন করে। শিল্পবিপ্লব মূলত মানুষের শারীরিক শ্রমের বিকল্প তৈরি করেছিল। কম্পিউটার মানুষের হিসাব ও তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ সহজ করেছিল। কিন্তু আধুনিক এআই মানুষের জ্ঞানভিত্তিক কাজের বড় একটি অংশে প্রবেশ করছে।

এ কারণেই বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষককে হয়তো এআইয়ের সঙ্গে কাজ করতে হবে। একজন সাংবাদিককে এআই ব্যবহার করেও তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হবে। একজন চিকিৎসককে এআই-নির্ভর সিদ্ধান্ত সহায়ক ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে। একজন প্রকৌশলীকে এমন সফটওয়্যারের সঙ্গে কাজ করতে হতে পারে, যা তাঁর অনেক প্রচলিত কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে দেবে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়তো হবে না—“এআই কি মানুষের জায়গা নেবে?”

বরং প্রশ্ন হবে—

“যে মানুষ এআই ব্যবহার করতে পারবে এবং যে মানুষ পারবে না—তাদের মধ্যে পার্থক্য কতটা হবে?”

ভয় নয়, প্রস্তুতি প্রয়োজন

এআইকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আবার প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতিকে অন্ধভাবে স্বাগত জানানোরও কারণ নেই।

প্রয়োজন ভারসাম্য।

যে প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করতে পারে, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে, শিক্ষা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে, উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে—সেই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে।

কিন্তু একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, এআই যেন মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।

প্রয়োজন শক্তিশালী নীতিমালা, নিরাপত্তা পরীক্ষা, জবাবদিহি, তথ্য সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ যেন কেবল কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে। কারণ এআইয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজের ওপর পড়বে।

 

মানুষই এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে। তাই এর ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও মানুষের।

আজ থেকে পাঁচ বছর পর পৃথিবী কেমন হবে, তা আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারছি না। তিন বছর আগের পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী যেমন এক নয়, আগামী পাঁচ বছরের পৃথিবীও হয়তো আজকের পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটাই অচেনা হবে।

মানুষ বিলীন হয়ে যাবে কি না—তা কেউ জানে না।

কিন্তু মানুষের কাজ, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো বদলাবে—এটি এখন আর কল্পনা নয়।

তাই বাংলাদেশের সামনে সময় এসেছে ভয় পাওয়ার নয়, প্রস্তুত হওয়ার।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কতটি হবে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে।

কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তাদের দক্ষতা কি ভবিষ্যতের কর্মবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

আর কতটি চাকরি তৈরি হবে—তার পাশাপাশি ভাবতে হবে, যে চাকরিগুলো আজ আছে, আগামীকাল সেগুলোর কতটা থাকবে এবং সেগুলোর জন্য কী ধরনের মানুষ প্রয়োজন হবে।

এআইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ থামানো যাবে না।

আবার এআইয়ের কাছে ভবিষ্যৎ সমর্পণ করাও যাবে না।

প্রযুক্তি মানুষের জন্য—মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়।

এই মৌলিক কথাটি ভুলে গেলে এআই আমাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী না হয়ে একদিন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতেই তৈরি করেছে। এখন সেই ভবিষ্যৎ যেন নিজের হাতেই নিরাপদ থাকে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *