বিদ্যমান পরিস্থিতি
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল সময় পার করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত প্রায় আঠারো মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সমযের নানান ঘটনাপ্রবাহের পর দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় রযেছে। সমস্যার বিপরীতে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে বোঝানো যায়। এই রচনায় একটি বিশদ বিশ্লেষণী প্রক্রিয়ায় সেই প্রয়াস গ্রহণ করা যাচ্ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনা, দুর্নীতি দমন এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে সংস্কারের দাবি ওঠে, যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং সংস্কার প্রতিবেদন তৈরি করে। তবে পাহাড়সম প্রত্যাশার বিপরীতে ইন্টেরিম সরকারের মেয়াদকালে জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই রয়ে গেছে।
অর্থনৈতিক খাতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অব্যাহত আছে। নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেলবাজারে অস্থিরতা দেশের ভেতরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তেল সংকটের কারণে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেট্রলপাম্পে অপেক্ষা করে। কারখানায় উৎপাদন ও দ্রব্যমূল্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের শিখনে নিশ্চিত প্রভাব পড়তে যাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের তা মনে করিয়ে দেয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির চেষ্টা চললেও এখনও তা আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ঋণখেলাপি ও অনিয়ম দুর্নীতির কারণে ব্যাংকিং খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুযায়ী সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তবে তা কতটা সুফল বয়ে আনবে তা সময়ই জবাব দেবে।
গেল বছর আগস্টের শুরুতে ব্যাপক অরাজকতা দেখা দিলেও পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে মাঝে মাঝে শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মীয় বা জাতিগত সংঘাত এবং বিভিন্ন স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে ছোটখাটো অস্থিরতা লক্ষ করা গেছে।
দীর্ঘকালীন ছাত্রআন্দোলনের পর স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে আসতে শুরু করেছে। তবে শিক্ষার সংস্কার, শিক্ষা ও শিক্ষকদের নানান সমস্যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। শিক্ষার মূল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনা, যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া, মানসম্মত শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার ভৌত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশকে নতুন সংকটে ফেলেছে। অনেকটা মানিক্যা চিপায় পড়ার মতো অবস্থা। পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ এখনও বজায় আছে। নিজেদের স্বার্থেও এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংকটসমূহ
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহনশীলতার ঘাটতি ও বিভেদ : দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সহিংসতা এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে।
২. দুর্নীতি ও শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা : প্রশাসনিক দুর্নীতি, ঘুষ, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাব সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ায়।
৩. অর্থনৈতিক অসমতা ও অবকাঠামোগত ঘাটতি : ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এছাড়া যানজট, অপ্রতুল বিদ্যুৎ, চাহিদার তুলনায় রেল ও নৌপথের সক্ষমতার ঘাটতি, এবং আধুনিক লজিস্টিক সুবিধার অভাব ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক বিকাশে বড় বাধা।
৪. জনসংখ্যা ও মানবসম্পদ সমস্যা : বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন। একইসঙ্গে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে।
৫. জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বন উজাড়, পরিবেশ দূষণ, নদী ভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পানি ও মাটির লবণাক্ততা প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি করে।
৬. রপ্তানির একমুখী নির্ভরতা : বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বিশ্ববাজারে এই খাতে যে-কোনো ধরনের মন্দার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।
৭. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে কম মনোযোগ : শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্ব প্রদান আধুনিক দেশ গঠনে অন্যতম পদক্ষেপ। দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে দেশের অর্থনীতি স্তিমিত হয়ে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে আমরা শিক্ষার সুবিধা পৌঁছে দিতে পারছি না। স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাত ধুকছে। সব সরকারের কাছেই এটি একটি অবহেলিত খাত। স্বাস্থ্য খাত চলে গেছে প্রাইভেট সেক্টরের নিয়ন্ত্রণে। ফলে স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টি সেবার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের জনগণের মধ্যে।

বাধাসমূহ দূর করার জন্য সমাধান প্রস্তাবনা
১. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা : উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ‘জাতীয় সনদ’ বা ঐকমত্য তৈরি করতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও অব্যাহত থাকবে। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।
২. দুর্নীতি দমন ও ডিজিটাল শাসন : দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। প্রশাসনিক কাজে সর্বোচ্চ ডিজিটালাইজেশন (ই-গভর্ন্যান্স) চালু করতে হবে, যাতে মানুষ সরাসরি অনলাইনে সেবা পেয়ে দালাল ও ঘুষের শিকার না হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে স্বচ্ছ নেতৃত্ব তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে। এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
৩. অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন : পোশাক খাতের পাশাপাশি ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি), সেবা খাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি ও রপ্তানী, ইলেকট্রনিক্স, হালকা প্রকৌশল, এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে (অ্যাগ্রো-প্রসেসিং) বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বাড়াতে হবে। মেট্রোরেলের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নদী ও রেলপথের আধুনিকায়ন করতে হবে।
৪. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান : শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্তবিদ্যাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বদলে দক্ষতাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সহজ শর্তে ঋণ (স্টার্টআপ ফান্ড) প্রদান করতে হবে।
৫. জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশ রক্ষা : ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও দক্ষতা দেখাতে হবে। উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু তহবিল আদায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে বিনিয়োগ বাড়ানো, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানী উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। বন সংরক্ষণ, পুনর্সৃজনে উৎসাহ ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশসম্মত ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে হবে।
৬. কর ব্যবস্থার সংস্কার ও সামাজিক নিরাপত্তা : কর ফাঁকি রোধে করব্যবস্থাকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হবে। ধনী শ্রেণির ওপর করের হার বাড়াতে হবে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের করমুক্ত সীমা বাড়াতে হবে। প্রবীণ নাগরিক, অসহায় এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা জাল গড়ে তুলতে হবে, যা অর্থনৈতিক অসমতা কমাবে।
৭. বৈদেশিক নীতি ও কূটনীতির সম্প্রসারণ : কেবল পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভর না করে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। রপ্তানির নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে।
৮. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিতে বিনিয়োগ বাড়ানো : শিক্ষায় বিনিয়োগ সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ। সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠনে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। পরিবার পরিকল্পনা সেবা ধারাবাহিক ও সহজলভ্য করা জনসংখ্যা রোধে ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। মনে রাখতে হবে, রাশিয়া পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে যেই দেশের লোকসংখ্যা আমাদের এই ক্ষুদ্র দেশের তুলনায় কম । বিশাল কম দক্ষ জনগোষ্ঠী দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহজ হবে না।

উপসংহার
বাংলাদেশের উন্নয়নের বাধাগুলো অনতিক্রমণীয় এমন নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছা, পরিকল্পিত প্রচেষ্টা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। যদি দুর্নীতি ও রাজনীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন করা যায়, তবে বাংলাদেশ নিশ্চিতই আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘পুনর্গঠন বা পরিবর্তনশীল’ পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে দেশের মানুষের মধ্যে একধরনের আশা ও প্রত্যাশা কাজ করছে। তবে এই পরিবর্তনশীল সময়টি যে কতটা শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগিয়ে যাবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিপক্কতা, সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে দক্ষতা এবং দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর।
মোহাম্মদ হাফিজুল ইসলাম। উন্নয়ন ও পরিবেশ কর্মী। সদস্য, জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা); প্রধান উপদেষ্টা, রাঙাটুঙ্গী ওমেন্স ফুটবল ক্লাব; উপদেষ্টা, কালীগঞ্জ কল্যাণ সমিতি; সমন্বয়ক, শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলন। সংযোগ : hafijcare@yahoo.com



