খেলা

অস্ট্রেলিয়ার দুর্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়

শেয়ার করুন:

—২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান
—৯ উইকেটে হারিয়ে ক্যাঙারুদের মাটিতে নতুন ইতিহাস শান্তদের

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। যে দেশে টেস্ট ক্রিকেটের পরাশক্তিরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও জয়ের দেখা পায়নি, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই তাদের ঘরের মাঠে ৯ উইকেটে হারিয়ে অবিশ্বাস্য এক কীর্তি গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি নতুন এক মাইলফলক।

২৩ বছর পর দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েই প্রথম টেস্ট জয় পেল বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের সফরে দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই দাপটের সঙ্গে জয় তুলে নিয়ে পুরোনো ব্যর্থতার স্মৃতি মুছে দিল টাইগাররা।

ডারউইন টেস্টে ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। হাসান মাহমুদ একাই নেন ৬ উইকেট। এরপর ব্যাট হাতে দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান—অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বিশাল লিড।

বাংলাদেশের এই ইনিংসে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। অসাধারণ ব্যাটিংয়ে তুলে নেন ১০১ রান। অধিনায়ক শান্ত করেন ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজ খেলেন ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। ফলে শুধু বোলিং নয়, ব্যাটিংয়েও অস্ট্রেলিয়াকে টেক্কা দেয় বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াকু ইনিংসও শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের রক্ষা করতে পারেনি। মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত স্পিনে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। মিরাজ নেন ৫ উইকেট। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

সেই লক্ষ্য বাংলাদেশ পেরিয়ে যায় মাত্র এক উইকেট হারিয়ে। তাতেই নিশ্চিত হয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশ এগিয়ে গেল ১-০ ব্যবধানে।

দলীয় সাফল্যের অনন্য নজির

এই জয়কে কোনো একক ক্রিকেটারের কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য, তানজিদের শতরান, শান্তর ৮৪ এবং পুরো দলের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্স—সব মিলিয়েই এসেছে এই ঐতিহাসিক জয়। ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন হাসান মাহমুদ।

বাংলাদেশের এই জয়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার মর্যাদা। টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দলকে তাদের নিজেদের মাটিতে হারানো যে কত কঠিন, তার প্রমাণ অন্য দলগুলোর ইতিহাসেও রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় পেতে দক্ষিণ আফ্রিকার লেগেছিল ৫২ বছর, নিউজিল্যান্ডের ৪২ বছর এবং ভারতের ৩০ বছর। বাংলাদেশ সেই অপেক্ষা করেছে ২৩ বছর—আর তাও দ্বিতীয় সফরেই পেয়েছে ঐতিহাসিক জয়।

অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এই জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পেস বোলিংয়ে। গত কয়েক বছরে টেস্ট ক্রিকেটকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলেই পেসারদের মধ্যে বিশ্বমানের হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।

সামনে এখন সিরিজ জয়ের হাতছানি

ডারউইনের এই জয় বাংলাদেশের সামনে খুলে দিয়েছে আরও বড় সম্ভাবনার দরজা। দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশ এখন সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় যদি হয় ইতিহাস, তবে সিরিজ জয় হবে সেই ইতিহাসের আরও বড় অধ্যায়।

২৩ বছর আগে যে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল, সেই বাংলাদেশই এবার স্বাগতিকদের চার দিন ধরে চাপে রেখে শেষ পর্যন্ত তুলে নিল দাপুটে জয়। ক্রিকেটের পরাশক্তির দুর্গে বাংলাদেশের এই বিজয় তাই শুধু একটি জয় নয়—এটি আত্মবিশ্বাস, সামর্থ্য ও বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক শক্তিশালী ঘোষণা।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *