বিনোদন

ঢাকার মঞ্চে বদরুজ্জামান আলমগীরের চার নাটক || আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

একই সময়ে ঢাকার মঞ্চে বদরুজ্জামান আলমগীর রচিত ৪টি নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। নাটকগুলো বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও মূল্যবোধের গভীর ও মহাকাব্যিক অন্বেষার অনন্য স্মারক। তাদের প্রকাশভঙ্গিমা, বিন্যাস এবং নীরিক্ষাও আলাদা আলাদা। নাটক ৪টি যথাক্রমে—’নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে’, ‘পুণ্যাহ’, ‘যোজনগন্ধা মায়া’ ও ‘এককোটি মনোয়ারা’। যে চারটি নাট্যদল নাটকগুলো মঞ্চে আনছে তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে মৌলিক ও প্রতিনিধিত্বশীল; নাট্যদলগুলো যথাক্রমে— থিয়েটার ৫২, নাট্যকেন্দ্র, বটতলা ও পালাকার।

থিয়েটার ৫২ প্রযোজনা করছে—নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে; নাট্যকেন্দ্র-এর পরিবেশনা— পুণ্যাহ; বটতলা-এর মঞ্চায়ন—যোজনগন্ধা মায়া; পালাকার-এর উপস্থাপনা—এককোটি মনোয়ারা। এবং চারটি প্রযোজনাই নির্মিত হয়েছে চারজন ভিন্ন নির্দেশকের সৃজনশীল ভাবনায়, যা বদরুজ্জামান আলমগীরের নাট্যরচনার বহুমাত্রিকতা ও গ্রহণযোগ্যতার উজ্জ্বল প্রমাণ।

থিয়েটার ৫২-এর প্রযোজনা—নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে—নির্দেশনা দিয়েছেন জয়িতা মহলানবীশ। লোকজ ঐতিহ্য, প্রতীকী ভাষা, কল্পনা এবং সমাজবাস্তবতার নিগূঢ় অন্তঃশীল বয়ান এই নাটক ইতোমধ্যেই দর্শকদের জন্য এক সংবেদনশীল নাট্যাভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে।

পুণ্যাহ নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক। বাংলার জীবনধারায় লোকপ্রথা, লোকবিশ্বাসের শক্তি ও মর্মছেঁড়া কষাঘাতের সুতীব্র অভিব্যক্তি নাটক পুণ্যাহ। নাটক ও সাহিত্যপাড়ায় পুণ্যাহ তার স্বয়ংপ্রভায় সমুজ্জ্বল একটি নাম।

যোজনগন্ধা মায়া নির্দেশনা দিয়েছে ইমরান খান মুন্না। বাংলার পথে পথে ছড়িয়ে থাকা আত্মবলিদানের অঙ্গীকার, স্মৃতি-বিস্মৃতির জাল, তন্মধ্যকার ক্ষরণ, রুখে দাঁড়ানোর সূক্ষ্ম ও বেপরোয়া অনুভূতির বিন্যাস এই নাটক নাট্যপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে নাট্যদল পালাকার মঞ্চে আনছে বর্তমান সমাজ, রাজনীতি ও সমকালীন স্পর্শকাতর বাস্তবের এক খসখসে বিচ্ছুরণ। নাটকটি নির্মাণ করেছেন মীর মেহবুব আলম নাহিদ। এক দমবন্ধ কালের মোকাবেলাপ্রবন ঘন্টা বাজাতে সংকল্পবদ্ধ প্রযোজনা এককোটি মনোয়ারা।

নাট্যবোদ্ধাদের মতে, একজন নাট্যকারের চারটি ভিন্ন মাত্রার নাটক একই সময়ের আবর্তনে মঞ্চে হাজির থাকা শুধু একজন নাট্যকারের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি সমগ্র বাংলা নাট্যচর্চার এক অনন্য অর্জন। বদরুজ্জামান আলমগীরের নাট্যভাবনা, ভাষা, চরিত্র নির্মাণ এবং সমাজ-বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ তাঁকে সমকালীন নাট্যসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গ্যাছে। তাঁর নাটক নতুন প্রজন্মের নির্দেশক ও নাট্যদলগুলোর কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

এই চারটি নাটকের মঞ্চায়ন জনরুচির একটি বিশেষ প্রবণতারও ইঙ্গিত দেয়। এখন এমন একটা সময়ের ভিতর দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে যেখানে কথার চেয়ে শোরগোল বেশি, মর্মের চেয়ে আড়ম্বর ক্ষমতাবান। বদরুজ্জামান আলমগীরের চারটি নাটকসহ আরও এমন নাটক ও অন্তর্মুখী সংস্কৃতিচর্চার ভিতর দিয়ে নীরব প্রত্যয়ী এবং সামাজিক আত্মিক বিনির্মানের এক স্থির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাংলা নাটকের পথচলায় এ আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

যেমন দর্শকের জন্য, যেমন একটি সামগ্রিক নাট্যপরিসর তৈরি করার জন্য, তেমন একজন নাট্যকারের জন্যও এটি একটি সবিশেষ ঘটনা। আমরা তাই ফিলাডেলফিয়াপত্রিকার পক্ষ থেকে নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। নিচে সাক্ষাৎকারের কথোপকথনটুকু তুলে দেয়া হলো।

প্রশ্ন : এইমুহূর্তে বিভিন্ন নাট্যদল ঢাকার মঞ্চে আপনার ৪টি নাটক মঞ্চস্থ করছে—আপনার অনুভূতি কী?

বদরুজ্জামান আলমগীর : আমার মনে হয়—ব্যাপারটা ওইরকম—একজন বাবার মেয়ে বা ছেলে বড় হলে যখন তার বিয়ে হয়, তখন বাবার কাছে যেমন লাগে—আমার অনুভূতি সেইরকম। একজন বাবার তো ওইটাই স্বপ্ন—ছেলেমেয়ে একদিন বড় হবে, নিজের মত করে ঘর বাঁধবে! তারা ঘর যেমন বাঁধে একইরকম বাবার অধিকারের বাইরেও কিন্তু অনেকটা চলে যায়। নাটকের মতই ব্যাপারটা দ্বান্দ্বিক।

প্রশ্ন : চারটি নাটকই ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশকের হাতে মঞ্চে উঠেছে—এই ব্যাপারটা আপনার কেমন লাগে?

বদরুজ্জামান আলমগীর : এটি খুব, খুব ভালো লাগছে আমার। আমার মনে হয়, ৪টি ঘোড়ার জন্য ৪জন সহিসই দরকার ছিল। তা না হলে একজন শেখের ৪খান বিবির মত হয়ে যেত! হা হা।

প্রশ্ন : দর্শকের জন্য আপনার কোন বার্তা আছে কী?

বদরুজ্জামান আলমগীর : প্রধানত নাটক যারা দেখতে যান তারা কিছুটা আগুপিছু করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই মানুষ। এইমুহূর্তে সারাদুনিয়া, বাংলাদেশ তো বটেই—মধ্যবিত্তের জন্য একটা হাবিয়া দোযখ, দুনিয়ার ইতিহাসে মধ্যবিত্ত এতোটা মর্মান্তিক পেরেশানির মধ্যে আর কখনোই ছিল না—তার কারণ একচেটিয়া করপোরেট বাণিজ্যের বিস্তার। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ কেবল বেঁচেবর্তে থাকার জন্য মধ্যবিত্ত হাঁসফাঁস করছে। এই অমানুষিক পরিস্থিতির মধ্যেও তারা যে মঞ্চে নাটক দেখতে যান—এরজন্য আমি তাদের কুর্নিশ করি। দুনিয়া একদিন নিশ্চয়ই অর্গানিক সৎ পরিশ্রমী ও শিল্পকাঙাল মানুষের হবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *