বর্ষায় বাজে কোন সুর
বৃষ্টিগুলো মাটিতে পড়ছে। অঝোরে। পড়ছে এবং ছিটকে যাচ্ছে চারপাশে। প্লাস্টিকের পাতলা স্লিপার বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাকপ্যাক এগিয়ে যাচ্ছে। রংচটা পুরোনো ছাতা এগিয়ে যাচ্ছে। এবারের বর্ষার বিশেষ আকর্ষণ স্বচ্ছ্ব প্রিন্টেড বর্ষাতি। ব্যাগ ভর্তি বর্ষাতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গুলবাহার। তার সালোয়ার কামিজ ভিজে যাচ্ছে। বর্ষাতি বিকোচ্ছে ভালোই। কোম্পানির হেব্বি লাভ।
গুলবাহার কালো ছাতার আড়াল থেকে আকাশ দেখার চেষ্টা করল। কিছু বৃষ্টি ফোঁটা পড়ল তার মুখে। বৃষ্টিগুলোকে মনে হচ্ছে শূন্য থেকে হঠাৎ নেমে আসছে, তীরের মতো ঝাঁক বেধে বেঁকে পড়ছে। রাস্তায় জল জমে গেছে। গাড়িগুলো স্পিডে যেতে গিয়ে জল ছিটাচ্ছে লোকের গায়ে। লোকেরা রেগেমেগে এন্তার গালাগালি দিচ্ছে। একদঙ্গল নোংরা জামাকাপড় পরা ছেলে-মেয়ে রাস্তায় জমা জলের মধ্যে খেলা করছে। বেশ মজা। কাকগুলো ভিজে চুপসে গেছে। রাস্তার পাশে দু’একটি গাছ এখনো যা অবশিষ্ট আছে কি ফ্রেশ আর কি যে সবুজ! বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। আরো জল জমছে।
গুলবাহার সালোয়ার গুটিয়ে নিয়েছে। তাও হাঁটুর নীচের দিকটা ভিজে গেছে। জলের মধ্যে অজস্র নোংরা। হাইড্রান্ট ও রাস্তার জল মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। জল ভেঙে এগোতে গিয়ে গতি কমে যাচ্ছে। তা হোক, এই বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। যা গরম পড়েছিল। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া আসছে কোথা থেকে। কোথাও দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। প্রথম জলের ফোঁটাগুলো যখন মাটিতে পড়ছিল অদ্ভুত গন্ধ এসে লাগছিল নাকে। মাটির নাকি ধুলোর? বৃষ্টি বিন্দুগুলো ধুলো মেখে ধুলোর এক-একটা বল হয়ে গড়িয়ে পড়ছিল।
গুলবাহার ইচ্ছে করেই অলিগলিতে ঢুকে পড়ছে। নানারকম নোংরার সঙ্গে জল মিশে বাজে গন্ধ উঠছে। একটু কষ্টই হচ্ছে তার। গলার কাছে শ্বাস যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। মুখ হা করে কয়েকবার শ্বাস টানে সে। পোশাক ভিজে গেছে। যা জোর বৃষ্টি ছাতায় আটকাচ্ছে না। মা দেখলে খুব বকবে। মাকে লুকিয়ে ঘরে ঢুকতে হবে। গলির ভেতর জমা জলে কয়েকটা রঙিন কাগজের নৌকো ভাসছে, লাল নীল সবুজ। হাসির শব্দে নীচতলার একটি জানলায় তাকায় গুলবাহার।
দু’জন বাচ্চা ও মা, মা-ই মনে হল, কাগজের নৌকো বানাচ্ছে আর ভাসিয়ে দিচ্ছে জলে। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল সে। কিছুক্ষণ দেখল ওদের। ওকে হঠাৎ খেয়াল করল মা। তার মুখে নিঃশব্দ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। হাসল গুলবাহারও। শব্দ থামিয়ে বাচ্চাগুলো কৌতূহলী মুখে দেখছে তাকে। মা একটা নৌকো জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিলেন তাকে। জলে ভাসিয়ে দিতে ইঙ্গিত করলেন। নৌকাটি নিল সে, ভাসিয়েও দিল। নৌকাটি ভাসতে ভাসতে চলে গেল অনেক দূর। গুলবাহার উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকল সেদিকে। কিছুক্ষণমাত্র। তারপর যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। হাসল ওদের উদ্দেশে। ব্যাগ খুলে তিনটে তিনরকম সাইজের বর্ষাতি বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে।
আর কী আশ্চর্য! ওদের কিছু ডেমনস্ট্রেট করতেও হল না। ওরা তিনজনেই পরে ফেলল বর্ষাতি। বাচ্চারা আনন্দে মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে লাফাচ্ছে। মহিলা দাম মিটিয়ে দিলেন। বর্ষাতি পরে ওরা হইচই করতে করতে একগাদা নৌকা নিয়ে গলির মধ্যে বেরিয়ে এল আর অজস্র নৌকা ভাসিয়ে দিল। গলির দু’পাশের জানলা-দরজাগুলো সব বন্ধ। গুলবাহার গলিটা ধরে সোজা এগিয়ে গেল।
বৃষ্টি আরো বেড়েছে। ছাতার ওপর প’ড়ে শব্দ করে ছিটকে যাচ্ছে বৃষ্টি। ছাতায় আটকাচ্ছে না। বাতাসে ছাতাটা বারবার মাথা থেকে সরে যাচ্ছে। একেবারে ভিজে গেছে সে। ছাতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। ছাতাটা সে বন্ধই করে ফেলল। ভিজতে ভিজতে এগিয়ে চলল অফিসের দিকে। জানে, গ্রুপ লিডার বকাবকি করবে, ‘আজ এর থেকেও বেশি বিক্রি হতে পারত’, ‘নিশ্চয় বেশি এফোর্ট দাওনি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আজকাল আর পাত্তাও দেয় না। উত্তরও দেয় না।
আজ বড় হালকা লাগছে। কী যেন একটা কষ্টও বুকের ভেতর পাক খাচ্ছে। বহুদিনের জমে থাকা কী যেন একটা ভারি হয়ে আছে বুকে। সালোয়ার কামিজ লেপটে গেছে শরীরে। চুপসে যাওয়া চুলগুলো মুখের ওপর নেমে আসছে মাঝে মাঝে। হাত দিয়ে তুলে দিচ্ছে সে। এই নির্জন গলিতে কেউ তাকে দেখছে না। ঠোঁট জোড়া কেঁপে ওঠে। একটা ল্যাম্প পোস্ট ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার মুখ, নাক, ভ্রূ, চোখ বেঁকেচুরে যায়। চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে সে। বৃষ্টির শব্দে মিশে যায় তার কান্না।
বাড়ি ফেরে গুলবাহার। রান্নাঘরের মেঝেয় একটা গামলা রাখা। গামলায় জল জমছে, ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ছে টুপটুপ। অন্ধকারের মধ্যে মা শুয়ে আছেন খাটে। টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় বোন পড়ছে। তাকে দেখে দৌড়ে আসে বোন। ব্যাগটা নামিয়ে নেয়। নিজের ঘরে ব’সে চা খেতে খেতে ছোট নোটবুকটায় লিখে রাখে সে, ‘সবার জন্য বর্ষার উপযোগী জামাকাপড় কিনতে হবে। রান্নাঘরের ছাদটা বাড়িওয়ালাকে…’
তিনটি কিস্তিতে এই দিঘল আখ্যান, ‘গুলবাহারের ঋতুচক্র’, রইল উপরে এর দ্বিতীয় অংশ। প্রথম অংশ ‘গ্রীষ্মের গন্ধগুলো’। পরবর্তী কিস্তি, শেষ পর্ব, শিগগিরই প্রকাশ্য।

মৌসুমী বিলকিস। কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।



