নোয়াখালীর এক তরুণ আহমদউল্লাহ। জীবিকার খোঁজে তিনি একদিন পাড়ি জমালেন কলকাতায়। সময়টা ১৯২০ সালের আশেপাশে, অথবা তার কিছু আগে-পরে। তাঁর চোখে তখন হাজার স্বপ্ন, বুক ভরা সাহস। কলকাতায় পৌঁছেই তিনি একটি ব্রিটিশ জাহাজে চাকরি পেয়ে যান। সেই জাহাজে কাজ করতে করতেই একদিন এসে পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রে।
জাহাজ যখন বস্টন বন্দরে ভেড়ে, আহমদউল্লাহ সেখানেই নেমে পড়েন। তিনি আর ফিরে যান না। তাঁর সামনে তখন এক অজানা, অথচ নতুন সম্ভাবনায় ভরা দেশ—আমেরিকা।
আমেরিকায় শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন। স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কাজ করেন, শিখে নেন নতুন ভাষা, নতুন সমাজের নিয়ম। এই বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মাঝেই পরিচয় হয় ভিক্টোরিয়া ইচিভালিয়া নামের এক সহৃদয় নারীর সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধন—ইচিভালিয়াকে বিয়ে করে আহমদউল্লাহ নিউইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

এই জীবনের কথা আমাদের শুনিয়েছেন তাঁরই ছেলে জনাব আলাউদ্দিন। বাবার জীবনের এই অজানা অধ্যায় তুলে ধরার জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে শুরু করেন একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ। তখন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ইতিহাসগবেষক বিবেক বাল্ডের।
বিবেক বাল্ড আহমদউল্লাহর গল্পে এতটাই মুগ্ধ হন যে তিনিও জড়িয়ে পড়েন অনুসন্ধানে। তিনি বিবাহ নিবন্ধনের পুরনো নথিপত্র খুঁজতে যান নিউইয়র্ক সিটি কর্পোরেশনের রেকর্ড রুমে। সেখানেই তিনি এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন—আহমদউল্লাহরও বহু আগেই এই মাটিতে পা রেখেছিলেন আরও এক বাঙালি, নাম তাঁর মোকসেদ আলী।
নথিতে পাওয়া যায় দুই ভাইয়ের বিয়ের তথ্য, যাদের একজনের জন্ম নিউ অরলিন্সে এবং অপরজনের মিসিসিপিতে। তাঁদের পিতার নাম মোকসেদ আলী। অবাক করা তথ্য—এই সন্তানদের একজনের জন্মসাল ১৮৮০। অর্থাৎ, প্রায় দেড়শো বছর আগে আমেরিকার মাটিতে বসতি গড়েছিলেন এক বাঙালি মুসলমান পরিবার।

এই ঘটনা গবেষক বিবেক বাল্ডকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। তিনি শুরু করেন দীর্ঘ গবেষণা, খুঁজে আনেন হারিয়ে যাওয়া সেইসব গল্প, যেগুলো ইতিহাসের পাতায় কখনো লেখা হয়নি। তাঁর সেই গবেষণার ফসল হলো এক অসামান্য বই—‘The Lost History of South Asian America’, যা প্রকাশিত হয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে।
এই বইটি শুধু একটি ইতিহাস নয়, এটি হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, ত্যাগ আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের দলিল। যারা আগ্রহী, তারা বইটি অ্যামাজন থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।
এই বই বাঙালির বিস্মৃত ইতিহাসের এক নিখোঁজ সূত্র তুলে দেয় পাঠকের হাতে।
আশরাফুল ইসলাম আরিফ



