প্রবন্ধ সাহিত্য

বাঙালির উৎসব || ডা. জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শেয়ার করুন:

সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য শারদীয় দুর্গোৎসব এক বিশেষ আনন্দের উৎসব। মায়ের বাপের বাড়ি ফিরে আসার আনন্দে যেমন সবাই আপ্লুত হন, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি প্রত্যাশাও—অন্যায়, অশুভ ও অসুরশক্তির বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয় যেন পৃথিবী ও সমাজে শান্তি, ন্যায় ও আশার বার্তা নিয়ে আসে। আজকের পৃথিবী যখন যুদ্ধ, ধ্বংস, হিংসা ও অমানবিকতায় ভারাক্রান্ত, তখন দুর্গার এই আগমন আমাদের সবার জন্যই হোক আশার আলো ও শুভবোধের প্রতীক।

বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। অনাদিকাল থেকেই জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, ঋতুর আগমন, ফসল ঘরে তোলা কিংবা নানা ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজন—সবকিছুর সঙ্গেই বাঙালির জীবনে উৎসবের আমেজ জড়িয়ে আছে।

একসময় প্রচলিত ছিল—‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ছুটির দাবি উঠল। ব্রিটিশ সরকারও বিষয়টি বিবেচনায় নিল। পরে সমতার প্রশ্নে বাঙালি মুসলমানদের কাছেও জানতে চাওয়া হলো—তোমাদের উৎসব ও ছুটির তালিকা কী?

মুসলমানরা তখন কিছুটা বিপাকেই পড়লেন! এত পার্বণ তো তাঁদের নেই। শুরু হলো বইপত্র ঘেঁটে ইতিহাস থেকে উৎসবের তালিকা তৈরির চেষ্টা।

এই তালিকাটি আমার কাছে একসময় খুবই প্রিয় ছিল। পাকিস্তান আমল ও পরবর্তী বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলায় ইসলামি উৎসবের দিনগুলো আমার জীবনের মধুরতম স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।

দুই ঈদ ও রমজানের আচার-অনুষ্ঠান তো ছিলই। কিন্তু শবে বরাতের স্মৃতি ছিল আরও বর্ণিল। পাশের বাড়ি ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে হালুয়া-রুটি বিতরণ, ভাইবোন মিলে রাতের আলোকসজ্জা, তুবড়ি জ্বালানো, শহরের কোথাও কাওয়ালি বা গজলের আয়োজন—এসব ছিল আনন্দের অংশ। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে বিভিন্ন মাজারে গিয়ে সুফিদের গান ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ উপভোগ করেছি। ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম, ঈদে মিলাদুন্নবী, পীর ও স্বজনদের মাজার জিয়ারতও ছিল উৎসবের অংশ।

মহররমের সময় মেলা, লাঠিখেলা এবং বিশাল বিশাল তাজিয়া নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ—এসব ছিল শৈশবের সবচেয়ে আনন্দঘন স্মৃতিগুলোর একটি। তখন এসব আয়োজনকে অন্য কোনো ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে কম মনে হয়নি। কোনো আক্ষেপও ছিল না। বরং দুই ধর্মের বন্ধুরা একে অন্যের উৎসবে সমান উৎসাহে অংশ নিতাম।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানেও যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হলো। পূজামণ্ডপের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সাজসজ্জা ও আনন্দমুখর পরিবেশ ভালো লাগত। তবে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক শাসনের কারণে মেয়েদের দিকে বেশি সময় তাকিয়ে থাকার সাহস ছিল না! বাড়িতে খবর পৌঁছে গেলে আমার কলেজ প্রিন্সিপাল রাশ ভারী মা যে কী করতেন, তা কল্পনা করাই যথেষ্ট। তিনি কলেজে পড়ুয়া মেয়েদের উত্যক্ত করা কিংবা বখাটেপনা একেবারেই সহ্য করতেন না। তাই কলেজজীবনে দু-একজন হিন্দু মেয়েকে ভালো লাগলেও ভয়ে দূরত্ব বজায় রেখেছি। সে আরেক গল্প।

আসল পরিবর্তন শুরু হলো যখন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যপ্রাচ্যে চাকরি কিংবা হজ করতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে শুরু করল। এতে আপত্তির কিছু ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ করে সৌদি আরবের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবও দেশে বাড়তে লাগল। সেখানে ঈদ ও রমজান ছাড়া অনেক উপমহাদেশীয় ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রচলন না থাকায় কেউ কেউ সেগুলোকে ‘বিদআত’ হিসেবে দেখতে শুরু করলেন।

বিদআত অর্থ—নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে প্রচলিত ছিল না, এমন কোনো ধর্মীয় বিষয়কে পরে ধর্মের অংশ হিসেবে যুক্ত করা। এর ফলে উপমহাদেশে দীর্ঘদিনের কিছু ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। মহররম নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হলো। ধীরে ধীরে আমার শৈশবের পরিচিত অনেক আয়োজন হারিয়ে যেতে লাগল। হারিয়ে যেতে লাগল উপমহাদেশের বহু পুরোনো উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিও।

ধাক্কা লেগেছিল, অবশ্যই। কিন্তু বাঙালি তো সহজে হার মানার জাতি নয়।

ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে অসাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো নতুন আঙ্গিকে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করল। বাংলা নববর্ষের বর্ণাঢ্য আয়োজন, পিঠা উৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী, নজরুলজয়ন্তী, ভাষাশহীদদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারি, অমর একুশে বইমেলা, নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গানের আসর—এসব ধীরে ধীরে মানুষের বিনোদন ও সামাজিক মিলনমেলার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে।

আমেরিকায় এসে আরেকটি ভিন্ন বাস্তবতা দেখলাম। এখানে ভারতীয় ও বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা দিন দিন বড় আকার ধারণ করছে। অন্যদিকে দীপাবলি বা দিওয়ালি এখন শুধু দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আমেরিকার মূলধারার সমাজেও এর ব্যাপক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজাও ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং বিভিন্ন শহরে বড় পরিসরে আয়োজন হচ্ছে।

উৎসব ছাড়া জীবন যেন অনেকটাই মলিন হয়ে যায়। আর আমেরিকায় উৎসবের তো শেষ নেই। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংস্কৃতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে—প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো উপলক্ষে কার্ড, উপহার, সাজসজ্জা কিংবা পারিবারিক আয়োজন। শিশু, তরুণ, বয়স্ক—সবার জন্যই কোনো না কোনো উৎসব রয়েছে।

থাকুক না! মানুষ উৎসবে আনন্দ খুঁজে নিক। যে ধর্মেরই হোক, যে সংস্কৃতিরই হোক—উৎসব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দৈনন্দিন জীবনের দুঃখ, ক্লান্তি ও একঘেয়েমি ভুলে থাকার সুযোগ দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, উৎসব মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।

আমি আশাবাদী, শারদীয় দুর্গোৎসবও আগের মতো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের একটি সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি করবে।


ডা. জিয়াউদ্দীন আহমেদ । বাংলাদেশি-আমেরিকান অনকোলজিস্ট, সমাজকর্মক ও সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *