- নামের পেছনে ঋণ, রাজকীয় সিদ্ধান্ত ও উইলিয়াম পেনের বাবার স্মৃতি
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঐতিহাসিক অঙ্গরাজ্য পেনসিলভানিয়া। দেশটির ইতিহাস, স্বাধীনতার আন্দোলন, ধর্মীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অভিবাসী সমাজের বিকাশে এ অঙ্গরাজ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফিলাডেলফিয়া শহরকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে পেনসিলভানিয়ার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ‘Pennsylvania’ নামটির অর্থ কী, আর কীভাবে এই নামের জন্ম—তা অনেকের কাছেই অজানা।
পেনসিলভানিয়া নামটি মূলত ইংরেজি পদবি Penn এবং লাতিন শব্দ sylvania থেকে গঠিত। Sylvania শব্দের অর্থ বনভূমি বা অরণ্য। ফলে Pennsylvania-কে মোটামুটি ‘Penn’s woodland’ বা ‘পেনের বনভূমি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এই নামকরণের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ রাজপরিবার, একটি বড় ঋণ, ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং উইলিয়াম পেনের পিতার স্মৃতি।
রাজকীয় অনুদানে জন্ম নতুন উপনিবেশের
১৬৮১ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস উত্তর আমেরিকার একটি বিশাল ভূখণ্ড ইংরেজ কোয়েকার নেতা উইলিয়াম পেনের কাছে প্রদান করেন। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় পেনসিলভানিয়া প্রদেশ।
এই ভূমি প্রদানের পেছনে ছিল আর্থিক কারণও। উইলিয়াম পেনের বাবা অ্যাডমিরাল স্যার উইলিয়াম পেন ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তাঁর মৃত্যুর পর রাজা দ্বিতীয় চার্লসের কাছে তাঁর পাওনা অর্থের একটি অংশ বকেয়া ছিল। সেই পাওনা পরিশোধের অন্যতম উপায় হিসেবে রাজা পেন পরিবারকে উত্তর আমেরিকার এই বিশাল ভূখণ্ডের সনদ দেন।
তবে শুধু ঋণ পরিশোধের বিষয়টিই পুরো গল্প নয়। উইলিয়াম পেন এই নতুন ভূখণ্ডকে একটি আদর্শ সমাজ গড়ার সুযোগ হিসেবেও দেখেছিলেন। কোয়েকার হিসেবে তিনি ধর্মীয় সহনশীলতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ছিলেন।

‘নিউ ওয়েলস’ থেকে ‘সিলভেনিয়া’
নতুন ভূখণ্ডের নাম কী হবে—এ নিয়ে উইলিয়াম পেনের নিজেরও একটি পরিকল্পনা ছিল। তিনি অঞ্চলটির নাম ‘New Wales’ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি ওঠে।
এরপর পেন ‘Sylvania’ নামটি প্রস্তাব করেন। লাতিন silva থেকে আসা sylvania শব্দের অর্থ বনভূমি—যা ওই সময়ের ঘন বনাঞ্চলপূর্ণ ভূখণ্ডের সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
কিন্তু এখানেই আসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নির্দেশে ‘Sylvania’-এর আগে ‘Penn’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। ফলে নাম দাঁড়ায় Pennsylvania।
উইলিয়াম পেনের নামে নয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় রয়েছে। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, পেনসিলভানিয়ার নাম সরাসরি উইলিয়াম পেনের নামে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, রাজা দ্বিতীয় চার্লস মূলত উইলিয়াম পেনের পিতা অ্যাডমিরাল স্যার উইলিয়াম পেনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতেই ‘Penn’ নামটি যুক্ত করেছিলেন।
উইলিয়াম পেন নিজেও এই নাম নিয়ে প্রথমে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, কোয়েকার সমাজের কাছে এটি নিজের নামে ভূখণ্ডের নামকরণ করে আত্মপ্রচারের মতো মনে হতে পারে। ঐতিহাসিক বিবরণে এমন কথাও পাওয়া যায় যে, তিনি নামটি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন এবং রাজকীয় কর্মকর্তাদের কাছে আর্থিক প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজা তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেননি।
পরে উইলিয়াম পেন এই নাম মেনে নেন এবং এটিকে তাঁর পিতার স্মৃতির প্রতি সম্মান হিসেবে গ্রহণ করেন।

শুধু একটি নাম নয়, একটি আদর্শের জন্ম
পেনসিলভানিয়ার ইতিহাস শুধু নামকরণের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। উইলিয়াম পেন এই ভূখণ্ডে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহনশীলতা থাকবে। তাঁর পরিকল্পনায় স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৬৮২ সালে পেন আমেরিকায় এসে তাঁর নতুন প্রদেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। একই সময়ে তিনি Philadelphia শহর প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিক শব্দ থেকে গঠিত Philadelphia নামের অর্থ ‘ভ্রাতৃপ্রেমের শহর’।
পরবর্তীতে এই শহরই হয়ে ওঠে আমেরিকার স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ১৭৭৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় Declaration of Independence গৃহীত হয় এবং ১৭৮৭ সালে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নকারী সাংবিধানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
আজকের পেনসিলভানিয়া
আজ পেনসিলভানিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য। রাজ্যটির বৃহত্তম শহর ফিলাডেলফিয়া এবং রাজধানী হ্যারিসবার্গ। শিল্পবিপ্লব, কয়লা ও ইস্পাতশিল্প, কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং বৈচিত্র্যময় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বিকাশে রাজ্যটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
বাংলাদেশি-আমেরিকানদের কাছেও পেনসিলভানিয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফিলাডেলফিয়া ও এর আশপাশের এলাকায় গত কয়েক দশকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে। ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, পরিবহন, পেশাজীবী ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি-আমেরিকানরা এখন এ রাজ্যের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি দৃশ্যমান অংশ।
প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী আগে ঘন বনভূমি ও নতুন উপনিবেশকে ঘিরে যে নামের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ সেই Pennsylvania যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য। আর নামটির মধ্যে আজও টিকে আছে একজন ব্রিটিশ নৌ-অ্যাডমিরালের স্মৃতি, তাঁর ছেলে উইলিয়াম পেনের স্বপ্ন এবং একসময়ের বিস্তীর্ণ বনভূমির পরিচয়।
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা


