লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংঘটিত এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন এক মা ও তার তিন মেয়ে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর একে একে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয়রা আটক করে গণপিটুনি দিলে পরে তারও মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সকাল সোয়া ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর মজুমদার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে ধারালো অস্ত্র হাতে অন্তর মজুমদার শাহিনুর বেগমের বাসায় প্রবেশ করেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আগে ওই এলাকায় বসবাস করতেন এবং পরিবারটির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। সেই সূত্রেই তিনি বাসায় প্রবেশ করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেশীরা জানান, বাসার সামনে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে এক নারী তার পরিচয় জানতে চাইলে অন্তর নিজেকে পানির পাইপ বা বাথরুমের ট্যাপ মেরামতের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তার আচরণে সন্দেহ হওয়ায় স্থানীয়রা সতর্ক হয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার শোনা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি হামলা চালানো হয়। পরে প্রতিবেশীরা ঘরে ঢুকে চারজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দ্রুত উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মামুনুর রশিদ জানান, শাহিনুর বেগম ও তার ছোট মেয়ে শিফাকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত ঘোষণা করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর মারা যান সায়মা আক্তার। অপরদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে কুমিল্লায় মৃত্যু হয় ইকরা আক্তারের।
হামলার পর অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, নিহতদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পরিবারের কর্তা কামাল হোসেনের মৃত্যু হয়। এরপর শাহিনুর বেগম একাই তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। বড় মেয়ে সায়মা উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ইকরা আক্তার রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট মেয়ে শিফা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ওই বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তবে কী কারণে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
একটি পরিবারকে প্রায় সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেওয়া এ মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ জানতে অপেক্ষা করছে দেশবাসী।



