বনভোজন, পিকনিক কিংবা চড়ুইভাতি—এসবের সঙ্গে আমরা যতটা পরিচিত, ক্যাম্পিং শব্দটার সঙ্গে ঠিক ততটা নই। শব্দটি হয়তো আমাদের কানে এসেছে বহুবার, কিন্তু তার ভেতরের জীবনবোধ, তার শৃঙ্খলা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে দর্শন, তা খুব একটা আয়ত্তে আসেনি।
চড়ুইভাতির সঙ্গে আমার পরিচয় বহু দিনের। গ্রাম বলতে আমার কাছে ছিল নানাবাড়ি। স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই যেন এক অলিখিত নিয়ম—নানাবাড়ি যেতেই হবে। খালাতো-মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে পনেরো-বিশ দিনের এক দীর্ঘ উৎসব শুরু হতো তখন।
শহরের বাড়িতে সবার আলাদা গেট, আলাদা দরজা। কারও ঘরে যেতে হলে কলিংবেল টিপতে হয়, অনুমতি লাগে। কিন্তু নানাবাড়িতে সেসব ছিল না। নানার ঘরের পাশেই তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ঘর, তার পাশে আরেকটি ঘর—সব যেন একই উঠানের বিস্তার; ঘরের পরে ঘর, মানুষের পরে মানুষ, আর সবগুলো ঘর মিলে একটানা আনন্দের ভুবন। কোথাও যেতে অনুমতির প্রয়োজন হতো না। আমাদের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।
ঘরে ঘরে তখন উৎসব। সবার স্কুল ছুটি হয়েছে। দীর্ঘ অবকাশ। ঈদের আনন্দ যেন আগেভাগেই নেমে এসেছে।
পনেরো-বিশটি ঘরের ছেলে-মেয়ে একত্র হলে আনন্দ না হওয়ার কোনো কারণ নেই। সারাদিন খেলাধুলা, পুকুরে সাঁতার, গাছে চড়া, দৌড়ঝাঁপ। খাবারদাবার যার যার নানার ঘরে। তবে একদিন আমরা ঠিক করতাম—সবাই মিলে একসঙ্গে খাব।

কে কত টাকা দেবে, সে হিসাব কখনো মাথায় আসেনি। শুধু আলোচনা হতো—কে কী আনতে পারবে। কেউ বলত চাল আনবে, কেউ মুরগি, কেউ ডাল। পরে দেখা যেত সবই হয়ে গেছে, কিন্তু কে কী নিয়ে এসেছিল তার হিসাব আর কখনো মিলত না। এখনো না।
আজ বুঝি, আমরা শুধু উদ্যোগ নিতাম। আসল আয়োজন করতেন নানা, নানি, মা, মামি, খালারা। আমরা ভাবতাম সব আমরাই করছি, অথচ আমাদের ফেলে রাখা ঝামেলাগুলো নীরবে সামলে নিতেন তাঁরাই। চুলায় আগুন ধরানোর কষ্ট, রান্নার ধোঁয়া, থালা-বাসনের শব্দ—এসবের ভেতরের শ্রম তখন আমাদের চোখে ধরা পড়ত না। সারাদিন দুষ্টামিতে ভরা থাকতাম; কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা, আর সন্ধ্যা পেরিয়ে ভোর হয়ে যেত, তার কোনো হিসাব আমাদের চোখে আটকাত না।
কেউ মাটিতে, কেউ চাটাইয়ে বসে খেতাম। কোনো বিচিত্রানুষ্ঠান ছিল না, মঞ্চ ছিল না, মাইক ছিল না। তবু আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না সেই প্রীতিভোজে।
সময় গড়িয়েছে। মানুষগুলো ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর নানা দেশে। এখন ভাবি, দেশে থাকতে আমাদের কেউই ক্যাম্পিং করিনি। শব্দটা হয়তো শুনেছি, কিন্তু প্রস্তুতি নিইনি কখনো। পরের প্রজন্মের মুখে প্রথম শুনলাম—তারা ক্যাম্পিংয়ে যাচ্ছে।
দেশ ছাড়ার প্রায় আট-নয় বছর পর আমেরিকায় এসে প্রথম ক্যাম্পিংয়ে যাওয়া। চাচাতো ভাইয়েরা প্রতিবছর যায়। আমার ছেলেরাও তাদের সঙ্গে যায়। আমি যাইনি কখনো। এবার ছেলের জোরাজুরিতে আর না করতে পারলাম না।

কী নিতে হবে, সে সম্পর্কেও খুব বেশি ধারণা ছিল না। ছেলে আর আমি আলাদা পোশাক, সাঁতারের কাপড়, মোবাইল চার্জের জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে রওনা দিলাম।
তবে ভরসার জায়গা ছিল অন্যখানে। চাচাতো ভাই মহাম্মদ ও মুজাম্মিলের প্রতিষ্ঠান ‘সিরাতুল জান্নাত সেন্টার (SJC)’-এর উদ্যোগেই আয়োজনটি হচ্ছিল। তাদের সঙ্গে অনেক শিশু-কিশোর, তরুণ এবং অভিভাবকও থাকবেন। ফলে কী কী নিতে হবে বা কী কী লাগতে পারে—সে-বিষয়ে আলাদা করে খুব বেশি ভাবতে হয়নি।
আমার ধারণা ছিল, এ-রকম আয়োজন যারা নিয়মিত করেন, তাদের হাতে থাকলে নতুন মানুষদের খুব বেশি বিপদে পড়তে হয় না। কোনোকিছু প্রয়োজন হলে নিশ্চয়ই কারও না কারও কাছে পাওয়া যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে গেলে অজানা জায়গাও অনেকটা আপন হয়ে যায়। সেই ভরসা নিয়েই ছেলে আর আমি যাত্রা শুরু করলাম। ক্যাম্পিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন হবে তা জানা ছিল না, তবে এতগুলো পরিবারের সঙ্গে যাচ্ছি বলেই মনে হচ্ছিল, অস্বস্তির চেয়ে আনন্দের সম্ভাবনাই বেশি।
গন্তব্য ছিল Hickory Run State Park. 3 Family Camp RD White Haven. PA-18661 প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। পাহাড়ের ওপরে ক্যাম্পিং এলাকা।
আমরা পৌঁছে দেখি, আগে থেকেই তিনজনের একটি দল সেখানে রয়েছে। আর আমরা প্রায় পঁয়তাল্লিশ জন। এত মানুষের খাবার, থাকা, বাথরুম—সবকিছু নিয়ে আমার মনে উদ্বেগ ছিল। কিন্তু অভিজ্ঞদের হাতে সেই উদ্বেগ বেশিক্ষণ টিকল না।

এ দেশে ক্যাম্পিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা আছে। যেখানে খুশি তাঁবু ফেলে থাকা যায় না। চাইলে জঙ্গলের ভেতরে কেবিন ভাড়া নেওয়া যায়, অথবা নির্ধারিত স্থানে তাঁবু খাটিয়ে থাকা যায়। অনুমতি নিতে হয়, ফি দিতে হয়। সেই ব্যবস্থার মধ্যেই থাকে বাথরুমের সুবিধা।
মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকা, খাওয়া, আলো—সব নিজেরাই গুছিয়ে নিতে হয়।
তবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা আমাদের নিজেদেরই ছিল। সঙ্গে ছিল একটি আধুনিক জেনারেটর। শব্দহীনভাবে প্রায় সারা রাত চলল সেটি, সামান্য কিছু জ্বালানির বিনিময়ে।
এর আগে যত জেনারেটর দেখেছি, সবই দেশে। সেগুলো চালু হলে কয়েক গ্রাম দূর থেকেও বোঝা যেত—কোথাও না কোথাও জেনারেটর চলছে। শব্দ শুনে মানুষ দেখতে আসত কী এমন আয়োজন হয়েছে। আর তেলের চাহিদার কথা তো আলাদা; কিছুক্ষণ পরপরই ট্যাংকিতে তেল ঢালতে হতো। তারপরও মাঝপথে থেমে যেত। কী হয়েছে জানতে চাইলে ডেকোরেটরের ছেলেটা বলত, “গরম হয়ে গেছে।”
আর এই জেনারেটর! বিদেশি বলেই হয়তো এমন অভিমানহীন। সারারাত নিরবে নিজের কাজ করে গেল। কোনো শব্দ করল না, কোনো অভিযোগও না। আশপাশের কেউ টেরই পেল না, ক্যাম্পের আলোগুলো আসলে কোন অদৃশ্য শক্তির ভরসায় জ্বলছে।

আমাদের থেকে কিছু দূরে একটি স্কুল দলের ক্যাম্প ছিল। তারা প্রায় বিশ-পঁচিশ জন হবে। বিকেল থেকে তাদের দেখেছি, কিন্তু কী করছিল ঠিক বুঝতে পারিনি। আমাদের মতো চিৎকার নেই, হৈচৈ নেই, উচ্চস্বরে গল্পও নেই। তারা নিজেদের মতো ছিল, প্রকৃতির ভেতরেই যেন মিশে ছিল।
অন্যদিকে আমাদের তরুণরা বিকেল থেকেই পাশের মাঠে ভলিবল খেলছিল। আমি শুধু কিছু ছবি তুললাম। খেলতে ডাকলেও সাহস হলো না।
বাবা-ছেলে মিলে আলো থাকতে থাকতে তাঁবু গুছিয়ে ফেললাম। দুপুরের খাবারও সেরে নিলাম। এক দিনের জন্য যত খাবার আনা হয়েছিল, দেখে মনে হচ্ছিল মাসখানেক থাকা যাবে। অথচ কারও কোনো অভিযোগ নেই। বরং আয়োজনের পরিপূর্ণতা বিস্মিত করছিল।
বিশ-ত্রিশটি তাঁবু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেলে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তার সৌন্দর্য ছবিতে ধরা পড়ে না। চোখের সামনে দেখা সৌন্দর্য অন্যরকম।
জঙ্গলে বন্য প্রাণী আছে। তবে আতঙ্কের কিছু নয়। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হয়। এত মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণীগুলোই হয়তো দূরে সরে ছিল।
এদিকে চলছিল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনা। দুর্বল নেটওয়ার্কে তরুণরা খেলার খবর দেখছে। পাশাপাশি ৫৩ বছরের অপেক্ষা শেষে নিউ ইয়র্ক নিক্সের এনবিএ শিরোপা জয় তাদের আনন্দকে আরও উসকে দিচ্ছিল।
সন্ধ্যার পর শুরু হলো ক্যাম্পফায়ার।
গ্রামে এর নাম ছিল আগুন পোয়ানো। শীতের রাতে শুকনো পাতা আর ডালপালা জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকার যে স্মৃতি, তারই এক আধুনিক রূপ যেন এই ক্যাম্পফায়ার।
এর দায়িত্ব ছিল তরুণদের হাতে। নানা রঙের শিখা, গল্প, হাসি আর খেলার উন্মাদনা মিলিয়ে রাত যেন উৎসবে ভরে উঠল। দিনের গরমের পর রাতের ঠান্ডা দ্রুত নেমে এলো। তখন আগুনই হয়ে উঠল নায়ক।
ক্যাম্পফায়ারের আরেকটি বাস্তব প্রয়োজনও আছে—বনের প্রাণীদের দূরে রাখা।
সবাই আগুন ঘিরে বসে আছে। কেউ গল্প করছে, কেউ খেলা দেখছে, কেউ উচ্চস্বরে হাসছে। পাহাড়ের নিস্তব্ধতা বারবার কেঁপে উঠছিল আমাদের শব্দে।
আমরা বড়রা শুনছিলাম, কিন্তু গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম, এদের বয়সই তো আনন্দ করার। আমরা না পারলেও ওরা একটু উচ্ছ্বাসে মেতে উঠুক।

রাত কেটে গেল।
ভোরে ঘুম ভাঙতেই শুরু হলো অন্য অভিজ্ঞতা।
আমাদের শব্দ নিয়ে তিন দিক থেকে অভিযোগ এল। কিছুক্ষণ পর আরও অভিযোগ। মুহূর্তেই যেন আগের দিনের সব আনন্দ মলিন হয়ে গেল।
তখন বুঝলাম, এ দেশে অনেকেই ক্যাম্পিংয়ে আসে না আড্ডা দিতে। আসে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে। আসে পাখির ডাক শুনতে, বাতাসের শব্দ শুনতে, নীরবতার ভেতরে নিজেকে খুঁজতে।
আর আমরা এসেছিলাম চড়ুইভাতির আনন্দ নিয়ে।
ওরা সামান্য খাবার নিয়ে রাত কাটায়, আমরা নিয়ে আসি উৎসব। ওরা নীরবতাকে উপভোগ করে, আমরা শব্দকে। ওরা প্রকৃতির কাছে আসে শুনতে, আমরা আসি বলতে।
ফিরে আসার পথে মনে হচ্ছিল—ক্যাম্পিংয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাঁবু খাটানো নয়, আগুন জ্বালানোও নয়। বরং শেখা, প্রকৃতিরও নিজস্ব ভাষা আছে। সেই ভাষা শব্দে নয়, নীরবতায় লেখা থাকে।
চড়ুইভাতির আনন্দে বড় হওয়া মানুষ হিসেবে সেই শিক্ষা আমার কাছে নতুন ছিল। কারণ আমরা প্রকৃতিকে সব সময় সঙ্গী ভেবেছি, কিন্তু কখনো তার নীরবতাকে আলাদা করে শুনতে শিখিনি।
আর সেই নীরবতার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে থাকে ক্যাম্পিংয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য।

আহমদ সায়েম। কবি ও গদ্যকার



