চলতি ২০২৬ সালের ১৭ জুন, বুধবার, বিশিষ্ট কবি ও নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীর-এর আপার ডার্বির বাসায় তাঁর পারিবারিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হলো অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘরোয়া সাংস্কৃতিক আড্ডা। সীমিত পরিসরের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন নাটক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত একঝাঁক গুণীজন। আন্তরিক আলাপচারিতা, ভাবনার বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো সন্ধ্যা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে অতি স্বল্প সময়ের জন্য কন্যাকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে আসা বিশিষ্ট নাট্যজন, নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেত্রী, এক্টিভিস্ট সামিনা লুৎফা নিত্রা কয়েক ঘণ্টার জন্য এই আড্ডায় যোগ দিয়ে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলেন। তাঁরা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নাট্য আন্দোলনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনায় অত্যন্ত বাস্তবানুগ সমস্যা, সম্ভাবনা ও সঙ্কট মোকাবেলার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে ঢাকায় মঞ্চনাটকের পরিস্থিতি, উদ্বেগ ও জেগে ওঠার অকুতোভয় দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন সুস্মিতা গুহ-রায়। বিশিষ্ট নাট্যজন, নাট্যনির্দেশক কৌশিক রায়চৌধুরী ও সেঁজুতি গুপ্ত তাঁদের অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাঁদের চিন্তা শেয়ার করেন; তাঁরা বহুদিন থেকে ডেলাওয়্যার ভেলি অঞ্চলে কুশীলব নামে একটি সক্রিয় নাট্যদল পরিচালনা করে আসছেন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সকলের শ্রদ্ধেয় সুস্মিতা গুহ-রায়, নিউইয়র্ক থেকে আগত রাহমান টিটো ও শায়লা ইমরোজ সিমি, বোস্টন থেকে আগত প্রাকৃত নৃ হায়দার, কবি আহমদ সায়েম, ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও সাহিদা আফরোজ নীপু, নার্গিস পারভীন, আসিকুর রহমান, জোহরা খাতুন কলি এবং আশরাফুল ইসলাম আরিফ।

ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত আড্ডায় সমসাময়িক নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাট্যচর্চার বিবিধ বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল বদরুজ্জামান আলমগীর রচিত নাটক- যোজনগন্ধা মায়া। এই নাটকটি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া এবং বাংলাদেশের ঢাকায় মঞ্চস্থ হয়েছে।বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যদল বটতলা এই নাটকের মঞ্চায়ন করেছে, তাঁরা আরও প্রদর্শনী করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই নাটকটি অবলম্বন করে পূর্ব ও পশ্চিমের মনস্তত্ত্ব, দর্শন, অভিনয়, বিন্যাস ও পরিবেশনা রীতির নানা খুঁটিনাটি বিষয় উঠে আসে- যা ছিল জ্ঞানগর্ভ ও হৃদয়গ্রাহী।
মোহাম্মদ আলী হায়দার ও সামিনা লুৎফা নিত্রা, যারা বাংলাদেশে একটি নাট্যদল পরিচালনা করছেন, তাঁরা নাট্যপ্রযোজনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ এবং বিশেষ করে নাট্যকার বিদেশে অবস্থান করলে নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে যে জটিলতাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণ উপস্থিত সকলের মধ্যে নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।
আলোচনায় সুস্মিতা গুহ-রায়, কৌশিক রায়চৌধুরী, রাহমান টিটো এবং কবি সায়েম আহমদও মূল্যবান মতামত প্রদান করেন। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণে আড্ডাটি কেবল স্মৃতিময় নয়, বরং ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক উদ্যোগের জন্য একটি অর্থবহ পরামর্শসভায় পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিদের জন্য আন্তরিক নৈশভোজের আয়োজন করেন নার্গিস পারভীন। উষ্ণ আতিথেয়তা, আন্তরিকতা এবং সৌহার্দ্যে ভরপুর এই আয়োজন উপস্থিত সকলের মন ছুঁয়ে যায়।
রাত প্রায় ১১টার দিকে প্রাণবন্ত আলোচনা ও স্মরণীয় মিলনমেলার সমাপ্তি ঘটে। বিদায়ের মুহূর্তে সবার মনে ছিল একটাই প্রত্যাশা—বাংলাদেশ ও প্রবাসের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক। নাটক, সাহিত্য ও শিল্পচর্চার এই সেতুবন্ধন আগামী দিনে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ুক।
আহমদ সায়েম। কবি ও গদ্যকার



