—“নারী সংক্রান্ত কোনো কথাই আমার সামনে বলবি না!” জীবনে প্রেম করেছে কি না জিজ্ঞেস করতেই খুব চটে গিয়ে কথাটা ইমরানকে বলে ফেলল ছোটন।
এমনিতে মানুষটা খুবই ভদ্র। কারো সাথে সহজে রাগে না। বন্ধুরা যখন সাহিত্য/কবিতা/গল্প নিয়ে কথা বলে তখন ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতে পারে। কাব্যের প্রতি বিশেষ ভালবাসার কারণে বন্ধু মহলে তার আলাদা একটা সম্মান আছে। কিন্তু তা আদায়ের বিন্দুমাত্র বাসনা তার নেই। কেউ সেরকম দৃষ্টিতে তাকালেই সে খাঁটি চট্টগ্রামের ভাষায় এমন রসিকতা করে যে বন্ধুরা তাকে মাথার উপর থেকে বুকে টেনে নিতে বাধ্য হয়। আহামরি টাইপের তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী তার নেই, স্বশিক্ষিত বলতে আমরা যা বুঝি সে ঠিক তাই। অনেক বিষয়েই তার গভীর জ্ঞান। তার চটুল কথাবার্তায় মাঝেমধ্যে এমন প্রাজ্ঞ দেখা যায় যে, ইংরেজী করে বলতে গেলে ‘প্রফাউন্ড’ ও ‘প্রফেনের’ এমন সংমিশ্রন আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। মানুষটির বিশেষ গুণ হল, তাকে কখনো গম্ভীর/রাগান্বিত অবস্থায় কোন বন্ধু আজও দেখেনি।
কিন্তু আজ সে সত্যি সত্যিই রেগে গেল। চটানো ঠিক হবে কি না না-জেনেই সাহস করে ইমরান তার দ্বিতীয় প্রশ্নটি করল।
“কেন বলব না? মেয়েরা তোর কি ক্ষতিটা করল?” কথাটা বলেই সে তার বিস্ফোরণ্মুখ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিন্তু না, এইবার ছোটন না চটেই খুব ঠান্ডা স্বরেই বলল—“উঠেছে যখন বলেই ফেলি। মনের কথা মনে চেপে রাখলে জ্বালা বেড়েই চলে, দেখি তোদের বলে খানিক হাল্কা হতে পারি কি না।”
রেমীকে আমি প্রথম দেখি আমাদের কোম্পানির এক মিটিংয়ে। সবাই বলে হাবা টাইপের সিনিয়র এক এক্সিকিউটিভের সাথে তার নাকি খুব ভাবভালোবাসা আছে। ওইদিনের মিটিংয়ে ও হাবা’টা তার পাশে ছিল। তারপরও সে আমার দিকে কেমন যেন অন্যভাবে তাকাতে লাগল। প্রশ্রয় পেয়ে আমিও এমনভাবে চেয়েছিলাম যে পরেরদিন রাত্রেই তার ফোন পেয়েছিলাম। তারপর হাবা এক্সিকিউটিভটাকে সাইডে রেখে আমরা অনেকদূর এগিয়েছিলাম। কতটুকু এগিয়েছিলাম তা ভাটিয়ারির “ক্যাফে২৪” আর GEC’র “সুগার বান” রেস্টুরেন্টের ওয়েইটার ও ঘণ্টা হিসেবে ঘোরা সেই রিকশাওয়ালারা আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবে।
তারপর ২০১২ এল, চাকরিটা হঠাৎ করেই চলে গেল। সাথে সাথে আমরাও ক্যাফে২৪, সুগার বান আর রিকশার বদলে কাজীর দেউড়ীর ‘শিশুপার্ক’ চকবাজারের ‘এলিট ফুডস’ আর হন্টন পদ্ধতিতে নেমে আসলাম। তখন সেও আমার পকেটের অবস্থা বুঝে একদিন গা ঢাকা দিলো। আমিও শিশুপার্ক, এলিট ফুডস আর হাঁটার শক্তি হারিয়ে ঘরবসা হয়ে গেলাম।
“একটা ছ্যাঁকা খেয়েই নারীর প্রতি তোর এত বিরাগ চলে এল!!!?” ইমরান আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল।
“না রে দোস্ত, এইটা তো জাস্ট স্টার্ট। গল্পের দ্বিতীয় ও শেষ পর্যায় এখনো বাকি আছে রে।”
এতক্ষণ চুপ করে শুনতে থাকা শাকিল প্রথম কথা বলে উঠল।
“তাই নাকি রে!? আমাদের আর তর সইছে না, তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে যা।”
তখন সবে রবি সার্কেল পপুলার হচ্ছে। বন্ধু গোবিন্দ আমার সার্কেল একাউন্ট থেকে পয়েন্টস ট্রান্সফার করার জন্য রবি সার্কেল খুলে দিয়েছিল। সেই সূত্র ধরেই ‘অর্ক’র সাথে পরিচয়। ওর একটা ভালো নাম ছিল, কিন্তু কথায় কথায় ছ্যাঁত করে জ্বলে উঠত বলে আমি তাকে অর্ক নামেই ডাকতাম। অর্ক হলো সূর্যের আরেক নাম। ২২/২৩ বছরের এক টগবগে তরুণের হঠাৎ কোনো কিশোরীর SMS পেলে যা হয় আমারও তখন ঠিক তা-ই হয়েছিল। পরিচয়ের প্রথম দুদিন পোক/কমেন্টে কখন পার হয়ে গেল খেয়ালই করিনি। তৃতীয়দিন নাম্বার আদান-প্রদান। সপ্তমদিন কথোপকথন। স্বপ্নের মতোই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। তবে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে নামতেও আমার বেশিদিন লাগেনি। যখন বুঝলাম আমার আবেগের সুযোগ নিয়ে সে আজ ১০০০, কাল ৫০০, পরশু ২০০০ করে টাকা ধার চাইতে লাগল। ধার চাইত এ-কারণেই বললাম, প্রত্যেকবারই ধার নেওয়ার সময় সে বলত, “টাকাটা একেবারে নিচ্ছি না, শোধ দিয়ে দিব। তবে কখন দিব তা বলতে পারব না। তুমি আমার থেকে চাইতে পারবা না। তবে দিয়ে দিব এইটা কনফার্ম।” বোধ যখন কাজ করা শুরু করল তখন আর টাকার বিনিময়ে প্রেম করা মেয়েটাকেও আর ভালো লাগছিল না। কেমন প্রস্টিটিউট প্রস্টিটিউট মনে হচ্ছিল। তাই আর না এগিয়ে ছয় মাসের মাথায় প্রেমের দ্বিতীয় পর্যায়েরও ইস্তফা দিলাম।
সবার জন্য সাত নাম্বার রাউন্ড চায়ের অর্ডার করে ইমরান কথাগুলো বলল।
“তারপর? গল্পের শেষ পর্ব শুরু কর গুরু।”
“এই মেয়েটার নাম ছিল আলভি। কথাবার্তা সব পাকা হওয়ার পরও কোনো কারণে তার বিয়েটা ভেঙে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সে মানসিকভাবে খুবই ভেঙে পড়েছিল। ‘কোয়ান্টাম গ্র্যাজুয়েট’ হিসেবে তাই মেয়েটাকে মানসিক প্রশান্তি দেওয়াটা আমার দায়িত্ব মনে করে এগিয়ে গিয়েছিলাম। কাজও হয়েছিল, দুইমাসের ভিতর তার অশান্ত মন শান্ত হলো। তারপর থেকে আমাদের হালকা যোগাযোগ ছিল। আগের দুইটা তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্যে তখন আমি কোনো মেয়ের সাথেই কথা বলি না। তাই ও ফোন করলেও রিসিভ করতাম না। তারপরও সে ‘এসএমএস’ করত। প্রথম প্রথম দিনে ৫/১০টা। এরপর আস্তে আস্তে সংখ্যাটা বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে তা একসময় ১৫০/২০০তে পৌঁছে গেল!”
এইটুকু বলেই ছোটন আট নাম্বার চায়ের অর্ডার দিলো। বেশ কিছুদিন হলো সে সিগারেট ছেড়েছে। এরপর থেকেই তার এই নতুন অভ্যেস।
“তারপর? তারপর?” হড়বড় করে বলে উঠল শাকিল। গল্পের মাঝে অপ্রত্যাশিত বিরতিটা তার একদম পছন্দ হয়নি।
“তারপর আর কি, অন্য সম্পর্কগুলোতে যা হয় আমাদেরও তা-ই হলো। কফিশপ, রেস্টুরেণ্ট, বাতিঘর এই করে করে আমরা তিনটা বছর কাটিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর অশিক্ষিত বড়লোকেদের মেয়েরা যে-রকম করে সেও ঠিক তা-ই করল। টাকাওয়ালা আরেকটা অশিক্ষিত ছেলের সাথে মালা বদল করে হাল্কা দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে বিদায় বলে দিলো। সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল আমি হচ্ছি তার ‘স্টপ গ্যাপ কম্প্যানিয়ন’। দেবীরূপে আসার বদলে তিনটা ডাইনী আমার জীবনে এসে চলে যাওয়ার পরই সমস্ত নারীকুলকে আমার কেমন ডাইনী ডাইনী মনে হয়। এরপর থেকেই আর আমি নারীজাতটাকে সহজে নিতে পারি না।”
ইমরান বলল, “তাই বলে আজীবন নারী ছাড়া থাকবি কীভাবে?”
“নারী ছাড়া থাকব কই বললাম!? স্টিফেন জাইগ-র ‘বালজাক’ পড়িসনি? না পড়লে ‘মাদাম দ্য বার্নি’ চ্যাপ্টারটা আজ বাসায় গিয়ে পড়ে নিস। ৪৫ বছরের মাদামের সাথে তরুণ বালজাকের কী উত্তাল ভালোবাসা ছিল! আমিও ঠিক একসময় ওইরকম কোনো মহিলার প্রেমে পড়ব। তারপর বালজাকের মতো আমিও বলব, The women of forty will do everything for you, the women of twenty nothing.”
পুড়তে যখন হবেই, তাহলে আগুনই ভালো। বিদ্যুতের শক কি আর আগুনে পোড়ার আশ মেটাতে পারবে?

আশরাফুল আমিন। কবি ও কথাসাহিত্যিক



