সাহিত্য

ঢাকা—ঐশ্বর্যের নগরী : ইতিহাসের পাতা থেকে এক ঝলক ।। মোহাম্মাদ শহীদুল্লাহ্

শেয়ার করুন:

“দ্য জেন্টেলম্যান’স ম্যাগাজিন”, লন্ডন, জুলাই ১৭৫৭
১৭৫৭ সালের জুনের শেষে নবাব সিরাজউদ্দৌলা-এর পরাজয়ের পরের মাসেই, জুলাইয়ে, লন্ডনের মাসিক পত্রিকা The Gentleman’s Magazine-এ বাংলার ঐশ্বর্য নিয়ে একটি বিস্তৃত ফিচার প্রকাশিত হয়। মি. কিচেনের আঁকা একটি মানচিত্র সেখানে সংযুক্ত ছিল, যেখানে গঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা East India Company-সহ ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। এই মানচিত্রকে ভিত্তি করেই পরবর্তীতে James Rennell তাঁর বিখ্যাত মানচিত্র (১৭৭৬) তৈরি করেন।

ঢাকা সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে—ঢাকা বাংলার সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ শহর, যা কর্কটক্রান্তির কাছাকাছি, গঙ্গার পূর্ব দিকের একটি শাখানদীর তীরে অবস্থিত। নদীর তীর ঘেঁষে বসতি গড়ার প্রবণতা ছিল প্রবল। বাড়িগুলোর গঠন ছিল অত্যন্ত সাধারণ—মাটির উপর বাঁশের কাঠামো, খড়ের ছাউনি, এবং বাড়ির মাঝে বাগান। এখানকার অনেক মানুষ জাহাজ নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন—যুদ্ধজাহাজ থেকে শুরু করে পণ্যবাহী ‘কান্ট্রি শিপ’ নির্মাণেও তারা পারদর্শী ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, এখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল অত্যন্ত সস্তা; অথচ ঢাকার তুলা ও সিল্ক ছিল পৃথিবীর সেরা মানের। এখানে ফরাসি ও ব্রিটিশ বাণিজ্যকেন্দ্রও ছিল। সব মিলিয়ে, ঢাকা ছিল এক অনন্য সমৃদ্ধ নগরী।

এরপর শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। ১৮০৮ সালে ঢাকার কোম্পানি প্রধান Charles D’Oyly ছিলেন শিল্পরুচিসম্পন্ন এবং দক্ষ চিত্রকর। তিনি হাতির পিঠে চড়ে জলাজঙ্গল অতিক্রম করে ঢাকার মুঘল স্থাপনাগুলোর স্কেচ আঁকেন। পরে সেগুলো লন্ডনে নিয়ে গিয়ে ‘Antiquities of Dacca’ নামে কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেন। প্রতিটি ছবির ক্যাপশন লিখেছিলেন বরিশালে কর্মরত আর্মি ডাক্তার James Atkinson। এটিকেই মূলত ঢাকার প্রথম প্রামাণ্য নথিভুক্ত ইতিহাস হিসেবে ধরা হয়।

ডয়লির বন্ধু ও আর্টশিক্ষক George Chinnery-এর আঁকা বেশ কিছু স্কেচও এতে স্থান পায়। তাঁর আঁকা “Modern Habitations at Dacca, 1823” (স্কেচ: ১৮০৮–১৮১১) ছবিটি একজন মসলিন কারিগরের বাড়ি তুলে ধরে—যেখান থেকে বুড়িগঙ্গা নদী দেখা যায়, আর আশেপাশে ছিল কিছু ইউরোপীয় স্থাপনা।

এই ছবির বর্ণনায় এ্যাটকিনসন উল্লেখ করেছেন ফরাসি পর্যটক Jean-Baptiste Tavernier-এর ভ্রমণকাহিনির কথা। তিনি দু’বার ঢাকায় এসেছিলেন; দ্বিতীয়বার (১৬৬৬ সালে) এসে লিখেছিলেন—ঢাকার প্রায় সব বাড়িঘরই মাটি, খড় ও বাঁশ দিয়ে তৈরি, আর বাড়ির মাঝখানে থাকত বাগান। তবে সুবাহদার এর বাসস্থান ছিল উঁচু দেয়ালের ভিতরে, তাবুর নিচে—যা লালবাগ কেল্লা-য় শায়েস্তা খাঁ-এর অবস্থানের কথাই নির্দেশ করে। ট্রাভের্নিয়ার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—প্রায় একশো বছর ব্যবধানে (১৬৬৬ থেকে ১৭৫৭) ঢাকার ঘরবাড়ির গঠন ও বৈশিষ্ট্যে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।

Battle of Plassey-এর পরপরই লন্ডনের পত্রিকায় বাংলাকে নিয়ে এমন আগ্রহ—সম্ভবত দীর্ঘদিনের আকর্ষণেরই বহিঃপ্রকাশ। শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নয়, ঢাকার পূর্বতন রাজধানী সোনারগাঁও ও রামপাল দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে বহুবার আসাম ও মগদের আক্রমণে লুণ্ঠিত হয়েছিল (Nature, 1907)।


মোহাম্মাদ শহীদুল্লাহ্। নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি অর্জনের পর ইউএসএর বিভিন্ন বিশ্ববিদ‍্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা সহ ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কাজে নিয়োজিত।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *