গল্প সাহিত্য

গুলবাহারের ঋতুচক্র / ০৪ || মৌসুমী বিলকিস

শেয়ার করুন:

হেমন্তের ঝরা পাতা


আজ সারাদিন বাড়িতে থাকবে গুলবাহার। অনেক কাজ জমে আছে। সেগুলো করার চেষ্টা করবে। যদিও সারা সপ্তাহ পরিশ্রমের পর অফ ডে-তে কাজ করতে একটুও ভালো লাগে না। তবু করবে। ঘর দুটো সুন্দর করে গোছাবে, যতটা সম্ভব। মায়ের সঙ্গে বকবক করবে। বোনের ওপর দিদিগিরি ফলাবে। বোনকে রাগিয়ে তুলবে। অবশ্য যদি মুড ভালো থাকে। এই সকাল বেলায় গলির মধ্যে কাকগুলো ছোকছোক করছে। যার যা পাচ্ছে মুখে নিয়ে পালাচ্ছে। পড়ে থাকা বাসনপত্রের এঁটোকাঁটার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

সরু গলির দু’পাশে মুখোমুখি ঘর। মাঝে মাঝে ট্যাপের জল নিয়ে কেউ কেউ ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। অন্য কেউ আপত্তি করলে চুপ ক’রে যায়। রাগে গরগর করতে করতে নিজের নিজের জলের পাত্র নিয়ে ঘরে চলে যায়। গলির মধ্যে বেশ চড়া রোদ এসে পড়েছে। লাইলনের দড়িতে ঝুলছে ভেজা জামাকাপড়। টুপটুপ জল পড়ে গলিটা ভিজিয়ে দিচ্ছে।

গুলবাহার মা ও বোনের সঙ্গে ব’সে এক কাপ চা খাচ্ছে। গল্প করছে ওদের সঙ্গে। সারা সপ্তাহের জমে থাকা গল্প। চা শেষ করে উঠে পড়ে সে। বোনকে পড়তে বসতে ব’লে মায়ের বিছানায় হাত দিল। বিছানা উলটেপালটে বাইরে গিয়ে ঝেড়ে আনল চুপসে যাওয়া কালচিটে তোশকটা। একা এত কিছু করছে দেখে মা প্রবল আপত্তি করছেন। গুলবাহার কোনো উত্তর না-দিয়ে একটা শক্তপোক্ত লাঠির সাহায্যে তোশকটা তুলে দিল তাদের টালির চালের ওপর। মা রেগে আছেন দেখে বালতির জল তুলে হাত ধুয়ে নিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল,

: অন্য দিকে মন না-দিয়ে চটপট রান্না করে ফেলো। একটু পরেই খিদে পেয়ে যাবে।

মার রাগ কমে না, ‘তোকে চুপচাপ বসিয়ে রাখা আমার বাপেরও অসাধ্য। এইটুকু মেয়ে ঘরে বাইরে…। কপাল আমার!’   

মা গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে ঢুকে যান। গুলবাহার শব্দ করে হাসে। পড়ার টেবিলে বসে চেঁচিয়ে ওঠে গুলবাহারের বোন,

: তোমরা একটু চুপ করবে, প্লিজ? আমি পড়ছি।

    মা চুপ করেন। গুলবাহার বোনকে ভ্যাঙায়,

: তোমলা একতু তুপ কলবে, পিলিজ।

: ভালো হবে না বলছি। আমি মোটেও ও-রকম করে…

   বোন চ্যাঁচায়। গুলবাহার আবার ভ্যাঙায়,

: আমি মোতেও ওলকম ক’লে…

: মা…

মা হাসেন। গুলবাহার হাসতে হাসতে পড়ার টেবিলের কাছে বোনের পাশে দাঁড়িয়ে চুল ঘেঁটে আদর ক’রে দেয়। বোন জড়িয়ে ধরে তাকে।

গুলবাহার মায়ের ও বোনের যে ক’টি জামাকাপড় আছে সুন্দর করে গুছিয়ে নিজের ঘরে আসে। নিজের ঘর বড় এলোমেলো। ছোট্ট রেডিওটা আস্তে করে চালিয়ে দেয়, বোনের টেবিল অবধি যেন শব্দ না-যায়। রেডিও অন করতেই গান, ‘নয়া বাড়ি লইয়া রে বাইদ্যা লাগাইলো বাইগন…’।

গুলবাহার একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। সে কাঁদলে বেগুন বেচে হার কিনে দেবে এমন মানুষ তো তার জীবনে নেই। বুকের ভেতর একরকমের ব্যথা টের পায় সে। রাস্তায় কিছু কিছু ছেলেকে দেখে ভালো লাগে তার। মজাও পায়। কিন্তু তারা পাসিং বয়েজ। সুখ, দুঃখ, হতাশা, ভালোলাগার কথা বলা যায় এমন কেউ নেই। এমন কেউ যে জীবনে আসবে তার অবসরটুকুও নেই তার। স্কুল, কলেজের বন্ধুবান্ধবরাও কাজ নিয়ে বা সংসার পেতে কে কোনদিকে ছিটকে গেছে জানে না সে। কারো কারো সঙ্গে রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয়,

: কী করছিস? বিয়ে করেছিস? তোদের তো আবার বিয়ে হলেও বোঝা যায় না।

গুলবাহার হেসে সৌজন্য বিনিময় করে। তারপর যে যার কাজে চলে যায়। কিন্তু ‘তোদের তো আবার…’-এর মৃদু শ্লেষ মনে থেকে যায় ঠিক। ওদের-আমাদের ব্যাপারটা আজো গেল না। বাঙালি মুসলিমদের একটা বড় অংশ হিন্দু ধর্মের নিম্নবর্ণের মানুষজন ছিল একসময়, অন্তত গবেষকরা তাই মনে করেন। নিম্নবর্ণের প্রতি যে বঞ্চনা, ঘৃণা, ছুঁৎমার্গ হিন্দু উচ্চবর্ণের ছিল তা অনেক হিন্দুর মধ্যে এখনো থেকে গেছে।

যে বাড়িতে থাকে গুলবাহাররা সে বাড়ি পাওয়া কি সহজ ছিল? তার আব্বার মৃত্যুর পর অফিসের কোয়ার্টার ছেড়ে দিতে হল। শেষে তার আব্বার এক বন্ধুর সহায়তায় এই বস্তিতে ঘর পাওয়া গেল। এখানেও নাকি দু’একজন আপত্তি করেছিল। শেষে আব্বুর বন্ধু তাদের অনেক বুঝিয়ে রাজি করায়। প্রথম প্রথম সেকি সমস্যা। কর্পোরেশনের ট্যাপে জল আনতে গেলে মেয়েরা সব সরে দাঁড়ায়, নিজেদের জলের পাত্র সরিয়ে রাখে। যেন ছোঁয়া লাগলে সব অশুদ্ধ হয়ে যাবে।

পাশাপাশি থাকতে থাকতে এখন অবশ্য সব ঠিক হয়ে গেছে। এমনকি আশেপাশের ঘরের দু’একজন ছেলে গুলবাহারের বা তার বোনের প্রেমেও পড়ে। ওরা মজা পায়। কিন্তু পাত্তা দেয় না। ওই দূর থেকে একটা হাসি ছুঁড়ে দেয়। কথা বললে বাড়ির লোকেদের সামনে বলে। কী থেকে কী ঝামেলা হয়। বিশেষ করে মা ওদের সতর্ক করে দিয়েছেন। এর মধ্যেই কম ঝামেলা তো পোহাতে হয়নি ওদের। এখন বরং গুলবাহার আশেপাশের পরিবারগুলো সমস্যায় পড়লে সাহায্য করার চেষ্টা করে।

গুলবাহারের মুখ ঘামে ভিজে গেছে। ঘাম গড়িয়ে থুতনির নীচ থেকে টপটপ করে ঝরছে। রেডিওর গান শেষ হয়ে গেছে। বিছানার ওপর সে বসেই আছে। ন্যাকা ন্যাকা গলায় এক মহিলা বলেই চলেছেন, ‘আমি এসে গেছি আপনাদের কথা শোনার জন্য। আজ আমরা শুনব আপনার কোনো গোপন কথা, যা এতদিন কাউকে বলে উঠতে পারেননি। অথচ সারাজীবন মনে মনে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ডায়াল করুণ টু টু ওয়ান সেভেন…। থাকুন আমার সঙ্গে। কোত্থাও যাবেন না’।

গান শুরু হয়, ‘গাতা রহে মেরা দিল, তুহি মেরি মঞ্জিল…’। বাড়িতে একটা টেলিফোন লাইন থাকলে মাঝে মাঝে কারো সাথে কথা বলা যেত। বাইরে গিয়ে কাজের ফাঁকে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। মোবাইলের যা দাম! পারবে না সে।

গুলবাহার ফ্যান চালিয়ে দেয়। এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল। খুব ঢিমে তালে ঘর গোছাতে গোছাতে নিজের কী গোপন কথা আছে মনে করার চেষ্টা করে। আব্বা মারা যাওয়ার পর নিজের জন্য খুব একটা ভাবনার সময় পায়নি গুলবাহার। তারজন্য সে খুব দুঃখিত তাও নয়। তখন অবশ্য সে খুব ছোট ছিল। বোন তো আরো পুচকে। কিছুই বুঝত না। দু’বোনের বয়সের ব্যবধান অনেকটা। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে অনেক ঘুরে ঘুরে কাজ যোগাড় করেছিল।

আব্বুর বন্ধু নিজের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তার জন্য কাজ যোগাড় করার চেষ্টা করেছিলেন ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের দোকান ইত্যাদি জায়গায় যেখানে কর্মী দরকার ছিল। কিন্তু কেউ কেউ মুসলিম, কেউ কেউ মেয়ে ইত্যাদি অজুহাত দেখিয়ে তাকে কাজ দিতে চায়নি। আব্বুর বন্ধু, বিমল সেনগুপ্ত তবু চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। একজন অনভিজ্ঞ মেয়ের জন্য এর থেকে ভালো কাজের সম্ভাবনা নেই কলকাতার বাজারে।

গুলবাহার ভাবে, বিমলকাকুর সঙ্গে মায়ের নাম জড়িয়ে লোকে কানাকানি করতে ছাড়েনি। উনি ঘন ঘন আসতেন, যখন আমদের অবস্থা ছিলো খুব খারাপ। এখন খুব কম আসেন। মায়ের সঙ্গে যদি সম্পর্ক থাকেই তাতে লোকের কী বুঝে পাই না। সে সময় সম্পর্ক হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। দুই মেয়ে নিয়ে অসহায় এক মহিলা আর সমব্যথী এক পুরুষ। কতদিনই বা মা শোক করে থাকতেন। আমি আর বিমলকাকু মাকে শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলাম।

আব্বুর সঙ্গে আমার খুব ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, ভেঙেও পড়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু বাস্তবও বুঝেছিলাম তাড়াতাড়ি। প্রায় প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম, আমার জন্য মা ও বোনের যেন কোনো সমস্যা না হয়। প্রতিদিন একাধিক জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিতে দিতে এ বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠলাম, অন্তত যেটুকু হলে এই শহরে একটা কিছু কাজ পাওয়া যায়। সেলস গার্ল এর কাজটাই খুব সহজে পাওয়া গিয়েছিল। এখনো আমি একই কোম্পানিতে কাজ করি। তাতে যেমন সুবিধা আছে, সমস্যাও আছে অনেক।

গুলবাহার ভাবে প্রত্যেকটা দিন কেমন পাতা ঝরার মতো ঝ’রে যাচ্ছে। পৃথিবীর বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়ছে তারও। জীবন থেকে কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে, কী যেন হারিয়ে যাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে মনে হল, যৌবন। প্রকৃতিতে সবকিছুই কোনো-না-কোনো প্রয়োজনে তৈরি হয়েছে। যৌবন কি এমনি এমনি বয়ে যাবে? এর জন্য যে খুব দুঃখ হয় তাও তো নয়।

আপাতত ঘর গোছাতে গোছাতে ডায়েরিটা খুলে বসে। ডায়েরি লেখা তার একমাত্র বিলাস। সব ফেলে সে লেখে, ‘যদিও প্রচণ্ড গরম এখন কিন্তু শীত আসতেও বেশি দেরি নেই। সবার গরম পোশাক ছিঁড়ে গেছে। কয়েকটা ভালো সোয়েটার ইঁদুরে কেটেছে। এখন কেনাকাটা করার টাকা নেই হাতে। একটু একটু করে টাকা জমাতে হবে। যৌবন কেন জমানো যায় না?’
(চলবে)


‘গুলবাহারের ঋতুচক্র’ গল্পপ্রবাহ 


মৌসুমী বিলকিস
কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *