বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
গুলবাহার গাঢ় হলুদ বাড়িটার কালচে লাল রঙের প্রবেশ দরজার সামনে মিষ্টি একটা গন্ধ পেল। বড় চেনা লাগল গন্ধটা। আরো একবার নাক টানতেই মনে পড়ে গেল। এ তো সেই ছেলেটির গন্ধ, শীতকালের ফুটপাথে যাকে দেখেছিল ডেনিম আর সাদা শার্টে, যার গন্ধ ভালো লেগেছিল তার। চোখ বন্ধ করে আবার সে নাক টানল। চোখ খুলতেই দেখল দরজাটা খুলে গেছে।
সেই ছেলেটি একই পোশাক পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ছেলেটি একটু ঝুঁকে ডান হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে তাকে ভেতরে ঢোকার আহ্বান জানাল। গুলবাহার মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঢুকে গেল ভেতরে। ছেলেটি ভারী ব্যাগ তার কাঁধ থেকে খুলে নিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিল। ছেলেটি তাকে বসতে ইঙ্গিত করল। ইঙ্গিত পালন করলো সে।
তার শরীর ডুবে গেল একটি সোফায়। ঘরের তাপমাত্রা আশ্চর্যরকম ব্যালান্সড, না-গরম না-শীত। বাইরে যথেষ্ট গরম। এখনো ঘাম লেগে আছে গুলবাহারের কপালে। এক গ্লাস ঠান্ডা রঙিন শরবত দিল ছেলেটি। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল সে। ছেলেটির হাতে আর-একটি গ্লাস। পরস্পরের উদ্দেশে তারা মৃদু হাসছে মাঝে মাঝে কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না।
গুলবাহার ঘরটা খুঁটিয়ে দেখে। দেয়ালে বড় বড় পেন্টিং, যার কয়েকটা শুধু রঙের আচড়। কোথাও একফোঁটা ধুলো নেই। ছেলেটি তার পাশে এসে বসল। আবার গন্ধটা পেল গুলবাহার। খুব ঘন হয়ে গন্ধটা নাকে ঢুকল। তার সামনের দেয়ালটা বাহারি পর্দায় ঢাকা। ছেলেটি তার হাত ধরে নিয়ে গেল পর্দার সামনে। মুগ্ধতা কাটছে না। ঘোরের মধ্যে গুলবাহার হেঁটে গেল ছেলেটির সঙ্গে।
ছেলেটি একটা বাহারি সিল্কের দড়ি ধরে টানতেই পর্দাটা স’রে গেল দু’পাশে। একটা বাগান তার অজস্র গাছ নিয়ে গুলবাহারের সামনে হাজির হল। কিছু কিছু গাছের ডাল রঙিন কচি পাতায় ছেয়ে আছে। কত রঙের ফুলে ছেয়ে আছে কিছু গাছ! ফুলসহ ডালপালাগুলি নুয়ে পড়েছে মাটিতে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। মাটিতে গালিচার মতো ছড়িয়ে আছে ঝরা ফুল, রঙিন পাতা।
ছেলেটি ওকে হাত ধ’রে নিয়ে যাচ্ছে বাগানের আরো ভেতরে। ফুল ও পাতা অনবরত ঝরছে ওদের ওপর। গুলবাহারের কোঁকড়ানো খোলা চুলের মধ্যে আটকে যাচ্ছে তাদের কিছু কিছু। অবাক হয়ে দেখছে সে। একটা গাছও চিনতে পারছে না।
বাগানটা এত বড় যে কোনো দিকের সীমানা চোখে পড়ছে না। আরো অবাক হলো সে, গুঁড়ি মোটা গাছগুলির নীচে মেয়েদের অজস্র জামাকাপড় টাঙানো, স্টান্ডিং হ্যাঙারে। হ্যাঙারগুলো কী সুন্দর। জামাকাপড়গুলোও। এই তো, এগুলো বোনকে খুব মানাবে। এই শাড়িগুলো খুব পছন্দ হবে মায়ের। খুব খুশি হল গুলবাহার।
নিজের পোশাকের দিকে দেখল সে। একেবারে পুরনো হয়ে গেছে। নিজের ডায়েরি, মা, বোন এবং হারিয়ে যাওয়া আব্বার কথা মনে পড়ল। কিছুক্ষণ সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। হঠাৎই সে খেয়াল করল এই জায়গাটার কিছুই সে চিনতে পারছে না। গাছগুলো এবং ছেলেটিও অসম্ভব অপরিচিত। সুন্দর গন্ধটাও সে পাচ্ছে না। বিচলিত হয়ে পড়ল সে।
বাগানময় দৌড়নোর মতো করে হাঁটতে থাকল। গাছগুলোর কাছে গিয়ে নাক টানল। না, কোনো গন্ধই নেই! নুয়ে পড়া ডালের ফুলগুলোর কাছে নাক নিয়ে গেলো। না, নেই! উদ্বিগ্ন হয়ে সে বাগানময় দৌড়তে থাকল। ছেলেটি তাকে অনুসরণ করছে এমনভাবে যেন জানত এরকমই হবে। গুলবাহার পাগলের মতো ছুটছে। তার ওড়না গলার দু’পাশে আটকে গিয়ে পিছনে উড়ছে।
শেষমেশ আবিষ্কার করল সে একটি পরিচিত গাছ। মাদার গাছটিকে সে জড়িয়ে ধরল। দু’গাল বেয়ে তখন দু’ফোঁটা অশ্রুও গড়াচ্ছে নিঃশব্দে। মাদার গাছটি ছেয়ে আছে অজস্র লাল রঙের ফুলে। পাতা নেই। ডালগুলি নগ্ন হ’য়ে ধরে আছে ফুল। তার মামাবাড়িতে অনেকগুলো মাদার গাছ এসময় লাল হয়ে থাকে। ফুলের নির্দিষ্ট করে সুমিষ্ট গন্ধ নেই কিন্তু একটা চেনা চেনা গন্ধ সে টের পায়।
ছেলেটি ওর কাছে আসে। পকেট থেকে বের করে একটি বোতল যে-বোতল গত শীতকালে গুলবাহার বিক্রি করেছিল। একটু ভাবে ছেলেটি এবং বোতলটি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। গুলবাহারের আরো কাছে স’রে আসে। চুলে মুখ ডুবিয়ে গন্ধ নেয়। শরীর সিরসির করে ওঠে গুলবাহারের। গাছ ছেড়ে গুলবাহারের দুই হাত ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে।
সেই চেনা গন্ধ আবার পাচ্ছে সে, আবার সে ঘোরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। ঠোঁট দু’টি উন্মুখ হয়ে উঠছে ওপরের দিকে। নেমে আসছে ছেলেটির ঠোঁট। মাদার গাছের অজস্র পাপড়ি ঝরে পড়ছে ওদের ওপর। গন্ধটা হারিয়ে যাচ্ছে।
গুলবাহার ছেলেটিকে ছেড়ে হাঁটতে থাকে ঘাস রাস্তায় যে রাস্তা অনেক অনেক দূর চলে গেছে। ছেলেটি দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে ওর চলে যাওয়ার দিকে। গুলবাহার হাঁটতেই থাকে। পিছনে পড়ে থাকে একটি ছেলে ও একটি ভারী ব্যাকপ্যাক।
সমাপ্ত

মৌসুমী বিলকিস। কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।



