
৩. বাতাসের গদ্যভাষা
খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আমি তোমার নাম ধরে চিৎকার করি। বাতাস সাক্ষী। আকাশ সাক্ষী। আর কেউ নেই। তুমি শুনতে পাবে না। আমি জানি, তুমি শুনতে পাবে না। এই চিৎকার কোনো মানুষের কানে পৌঁছানোর জন্য নয়। আমি চারপাশ দেখে নিয়েছি আগেই—মাইল মাইল ফাঁকা। রূপকথার তেপান্তরের মতো দিগন্তহীন মাঠ। শুধু ঘাস, আর ঘাসের উপর দিয়ে দৌড়ে-যাওয়া বাতাস। তাহলে কাকে ডাকি? এই মাঠের বুকে দাঁড়িয়ে কার উদ্দেশ্যে গলার সমস্ত শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে চিৎকার করি? ডাকটা বাতাসে উড়ে যায়। তারপর ঘুরে-ফিরে আবার আমার নিজের কানেই ফেরত আসে। প্রতিধ্বনি হয়ে বুকের ভেতর ধাক্কা মারে। আমি ছাড়া আর কে আছে যে শুনবে? কেউ নেই। তাহলে বুঝেছি। তোমার নাম ধরে এই যে চিৎকার—এটা তোমাকে শোনানোর জন্য নয়। এটা আমাকে শোনানোর জন্য।
বিকেল নেমেছে চরাচরে। আলো ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে, যেন ক্লান্ত কোনো নিঃসঙ্গ প্রেমিক। আর এই প্রান্তর—বিরান, বিধ্বস্ত, শূন্য। মাইল মাইল ফসলি মাঠ। একসময় এখানে ধানের শীষ দুলতো। এখন শস্য উঠে গেছে। মাটি ন্যাংটো। খড়ের গোড়াগুলো খোঁচা খোঁচা হয়ে আছে, যেন হাজারটা না-শুকানো ক্ষত। পরবর্তী শস্য বোনার সময় আসা পর্যন্ত এভাবে শূন্য পড়ে থাকবে এই জমি। এ প্রান্তরে কেউ আসে? না, আসে না। সাধারণত কেউ আসে না। কৃষক এখন তার উঠোনে। খলানে। শস্য মাড়াই করছে। আর এখানে? এই মাঠ এখন কৃষকের নয়। এখানে এখন বাতাসের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেই বাতাসের হাত ধরেই আমি আবার চিৎকার করি। কণ্ঠে রক্ত তুলে ডাকি। শব্দ ভাঙি। বর্ণ ভাঙি। অনু-পরমাণু করি তোমার নাম। বাতাস সেগুলো নিয়ে দিগন্ত পর্যন্ত ছুটে যায়। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তোমার নাম। কোথাও একটা ‘ত’, কোথাও একটা ‘ম’। তারপর অনেকক্ষণ পর…সেই ছড়িয়ে-পড়া অক্ষরগুলো আবার জড়ো হয়। বাতাস ক্লান্ত হয়ে ফেরত আসে। আমার কানের লতি ছুঁয়ে, চুলের ভেতর দিয়ে, সোজা আমার রক্তের ভেতর গিয়ে স্থির হয়। তুমি আসো না। কিন্তু তোমার নাম রোজ আসে।
রোদ তার শেষ আলোর পোশাক খুলে ফেলে দিলে বাতাসের পরশ আরও শীতল হয়ে আসে। ঘাসের ডগা আদ্র হয়ে ওঠে। ঘাসে পা ফেলে ফেলে হাঁটি। এক সময় মনে হয়—এখন ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ার ঠিক সময়। নিজের ছায়াকে ঘাসের উপর বিছিয়ে দিই। তারপর নিজের ছায়ার উপরই শুয়ে পড়ি। অনেক সময়। চুপচাপ। চোখ বন্ধ। শ্রবণে টের পাই বাতাস কতটা সক্রিয়। হঠাৎ সেলফোন বেজে ওঠে। প্যান্টের পকেটে হাত নিতে ইচ্ছে করে না। বাতাস তখন ফিসফিস করে কানের কাছে আসে—ফোনটা ধরো। ধরি। ওপাশ থেকে তোমার কণ্ঠে অভিমান ঝরে পড়ে—“এই—তোমাকে ফোনে পাচ্ছি না কেন?” আমি চুপ করে থাকি। বলতে পারি না—আমি তো এখানেই ছিলাম। ঘাসের বিছানায়, বাতাসের চাদরে, তোমার নাম ধরে চিৎকার করতে নিজেকেই খুঁজে চলেছি।
সন্ধ্যা গড়িয়ে পড়ে। আলোটা একটু একটু করে ফুরিয়ে যায়, যেমন করে ফুরিয়ে যায় মানুষের অপেক্ষা। এই মাইল-মাইল বিরান প্রান্তর এখন নীল-কালো। উপরে তারা নেই। নিচে মানুষ নেই। আছি শুধু আমি, আর আমার গলা-ভাঙা চিৎকারের হাজারটা টুকরো।
আমি ক্লান্ত। তবু শেষবারের মতো একবার ডাকি—তোমার নাম ধরে। এবার আর জোরে নয়, ফিসফিস করে। আশ্চর্য! এবার বাতাস আর নামটাকে ছিন্নভিন্ন করল না। সে নামটাকে কুড়িয়ে নিলো। একটা একটা অক্ষর জোড়া লাগালো। তারপর সেই গোটা নামটাকে বুকের ভেতর পুরে আমার চারপাশে চক্র দিয়ে ঘুরতে লাগলো। বাতাস ফিসফিস করে বললো, “তুমি যাকে ডাকো, সে নেই। কিন্তু তুমি যে-ভাবে ডাকো, সেই ডাকটাই আছে। আর সেই ডাকের নামই ভালোবাসা।” তারপর বাতাস থেমে গেল। প্রান্তর আরও নীরব হলো।
আর আমি প্রথমবারের মতো বুঝলাম— চিৎকার করে কাউকে পাওয়া যায় না। কিন্তু চিৎকার করতে করতে একদিন নিজেকেই পাওয়া যায়। এখন এই খোলা প্রান্তরে আমি একা নই। আমার ভেতরে তোমার নাম আছে। আমার রক্তে তোমার নাম আছে। আর আমার চারপাশে…বাতাসের গদ্যভাষা আছে। যে-ভাষায় কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাস আছে। যে-ভাষায় কোনো উত্তর নেই, শুধু প্রতিধ্বনি আছে। আর যে-ভাষা ফুরায় না— কারণ বাতাস যতদিন বইবে, মানুষ ততদিন কাউকে না কাউকে এভাবেই, এই প্রান্তরে দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডাকবে।

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।




দুপুর মৈত্র
August 23, 2026এই লেখা গদ্য কেনো, কবিতা কেনো নয়? লেখক এবং সম্পাদক উভয়ের কাছেই সবিনয় জিজ্ঞাসা রেখে গেলাম। তবে এ কথা সত্য লেখা হিসেবে ইহা উচ্চমার্গীয় বলে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে। ধন্যবাদ লেখক ও সম্পাদক সাহেবকে।
Suraj Das
August 23, 2026খুব সুন্দর লিখেছেন আপনি