সাহিত্য

লেখা সাক্ষি রয়।। আহমদ সায়েম

শেয়ার করুন:

‘বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার বড় কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর ধামাচাপা পড়ে যাবে।’—এই কথাটা শুধু হতাশা নয়, এ এক ভয়ংকর সামাজিক অভিজ্ঞতার সারাংশ। আমরা এমন এক সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের কান্নারও একটা “সময়কাল” নির্ধারিত হয়ে গেছে। পনের দিন, এক মাস, বড়জোর কয়েকটা ট্রেন্ডিং পোস্ট—তারপর নতুন কোনো রক্ত, নতুন কোনো ধর্ষণ, নতুন কোনো মৃতদেহ এসে আগেরটাকে সরিয়ে দেয়।

আমাদের রুচির দুর্ভিক্ষ আজ থেকে শুরু হয়নি। বহুদিন ধরেই আমরা ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হয়ে উঠছি। মানুষ অনেক কথা বলে,—কিন্তু কিছু কথা আছে যেগুলো শুধু মুখ থেকে আসে না, আসে বুকের গভীর ক্ষত থেকে। সুখ মানুষকে উজ্জ্বল করে, কিন্তু কষ্ট মানুষকে নগ্ন করে দেয়। তখন তার ভাষা আর সাজানো থাকে না, থাকে শুধু রক্তাক্ত সত্য। সেই সত্যই হয়তো একজন বাবাকে বলতে বাধ্য করেছে—“বিচার চাই না। আমার মেয়েও আর ফিরবে না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।”

এই কথাগুলো তিনি আকাশ থেকে কুড়িয়ে আনেননি। সমাজের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে বলেছেন। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘ ব্যর্থতা, মানুষের অবিশ্বাস, রাজনৈতিক অভিনয়, আইনের বাণিজ্য—সব মিলিয়েই এই বাক্য জন্ম নেয়। কতটা কষ্ট পেলে একজন বাবা বিচার চাইতেও ভয় পায়! কতটা অসহায় হলে সে বুঝে যায়—আদালতের কাঠগড়ায় নয়, তার সন্তানের মৃত্যু হারিয়ে যাবে পরিসংখ্যানে!

মাত্র সাত বছরের শিশু। বাবার কাছ থেকে অপহৃত হয়ে পরদিন যার মরদেহ পাওয়া যায় সরিষাক্ষেতে। এই সমাজে একজন বাবা তার সন্তানকে নিয়ে বের হবে কীভাবে? কার ওপর ভরসা করবে? রাস্তার মানুষ? প্রতিবেশী? শিক্ষক? ধর্মীয় বক্তা? রাষ্ট্র?

হে সমাজব্যবস্থার কারিগর, হে শিক্ষিত আলেম, হে শিক্ষিত নাগরিক—কেউই আজ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কারণ সমস্যা শুধু অপরাধীর নয়; সমস্যা আমাদের নীরবতারও। আমরা অপরাধকে ঘৃণা করার আগেই তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি।

আমি শুধু বাংলাদেশের কথা বলছি না। আমি যে দেশটায় আজ বাস করছি, সেই আমেরিকাও রক্তের গন্ধ থেকে মুক্ত নয়। এখানে স্কুলে ঢুকে ষোলো বছরের কিশোর গুলি চালায় সহপাঠীদের দিকে। শিশুরা বইয়ের ব্যাগের সঙ্গে বুলেটপ্রুফ ব্যাগও বহন করে। কোনো কন্সার্ট, কোনো সুপারমার্কেট, কোনো চার্চ, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়—কোথাও নিশ্চিত নিরাপত্তা নেই।

কলম্বাইন, স্যান্ডি হুক, উভালডে—নামগুলো এখন শুধু জায়গার নাম নয়, আধুনিক সভ্যতার ব্যর্থতার প্রতীক। একটা সভ্যতা যখন প্রযুক্তিতে পৃথিবী বদলে ফেলে, অথচ মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না—তখন সেই উন্নয়ন কেবল চকচকে ধ্বংস হয়ে দাঁড়ায়।

এখানেও মানুষ প্রতিদিন অকারণে মারা যায়। কখনো রাগে, কখনো বর্ণবাদে, কখনো মানসিক বিকারে, কখনো নিছক অস্ত্রের সহজলভ্যতায়। আর রাষ্ট্র? রাষ্ট্র প্রযুক্তির প্রদর্শনীতে ব্যস্ত, ক্ষমতার ডিজিটাল স্থাপত্য নির্মাণে ব্যস্ত। মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে নজরদারির উন্নয়ন দ্রুত হয় এখন।

রুচির দুর্ভিক্ষ একদিনে তৈরি হয় না। একটা সমাজ যখন বারবার মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, প্রতিভার বদলে ভাঁড়ামিকে পুরস্কৃত করে, তখন ধীরে ধীরে তার সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। তখন শিল্পের জায়গা নেয় কোলাহল, জ্ঞানের জায়গা নেয় প্রদর্শনী, সততার জায়গা নেয় অভিনয়।

আজ আমরা দেখছি—বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া মানুষও মানবিকতায় দেউলিয়া। শিক্ষিত হওয়ার অর্থ আর মনুষ্যত্ব নয়; বরং দক্ষ প্রতিযোগী হওয়া। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে ভয়ংকর রুচির মানুষ— যারা সফল, কিন্তু সংবেদনহীন; শিক্ষিত, কিন্তু বিবেকহীন।

হত্যা ও ধর্ষণের সংস্কৃতি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান না, এটা সভ্যতার আয়না। আমরা সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু নিজেদের মুখ দেখতে চাইছি না। কারণ সত্যটা ভয়ংকর— এই নষ্ট সময়ের জন্য শুধু খুনি দায়ী নয়, দায়ী দর্শকরাও।

যে-সমাজে মানুষ অন্যায়ের ভিডিও ধারণ করে কিন্তু হাত বাড়ায় না, যে-সমাজে শিশুর কান্না রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়, যে-সমাজে বিচার সংবাদশিরোনাম হয়ে থাকে কিন্তু বাস্তবতা হয়ে ওঠে না—সেখানে ধীরে ধীরে মৃত্যু স্বাভাবিক হয়ে যায়।

একসময় মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যেত খাদ্যের অভাবে। এখন মানুষ মারা যাচ্ছে মানবিকতার অভাবে।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—আমরা এই মৃত্যুতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। কিছুদিন শোক, কিছুদিন প্রতিবাদ, কিছুদিন ফেসবুকের কালো ছবি—তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। যেন মানুষ নয়, কেবল সংবাদ মারা গেছে।

তবু আমি বিশ্বাস করি, সব শেষ হয়ে যায়নি। কারণ এখনও কিছু মানুষ কষ্ট পেয়ে কথা বলে। এখনও কিছু বাবা বিচার না চেয়ে বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে। এখনও কিছু লেখক ঘুমাতে পারে না শিশুর লাশের খবর শুনে। এই অস্বস্তিগুলোই প্রমাণ করে—মানবিকতা পুরোপুরি মরে যায়নি।

হয়তো পৃথিবী বদলাবে না খুব দ্রুত। হয়তো আগামীকালও নতুন কোনো সরিষাক্ষেতে, নতুন কোনো স্কুলের করিডরে, নতুন কোনো শহরের অন্ধকারে পড়ে থাকবে মানুষের রক্ত।

তবু লিখতে হবে। কারণ লেখা কখনো কখনো বিচার না পেলেও সাক্ষি হয়ে থাকে। আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সাক্ষিদেরই মনে রাখে।

২১ মে ২০২৬


আহমদ সায়েম । কবি ও গদ্যকার

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *