প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে একত্র হওয়ার সুযোগ এলে খুব কম মানুষই তা হাতছাড়া করতে চান। আর যারা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত, তাদের কাছে এমন আয়োজন যেন বহুদিনের প্রতীক্ষিত এক মিলনমেলা। আড্ডা, আলোচনা, সৃজনশীল ভাবনার আদান-প্রদান এবং বাংলা ভাষার আবহে কিছু সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা তাদের হৃদয়ে সবসময়ই জাগ্রত থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। শারীরিক অসুস্থতা কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়ালেও সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। মানুষের সঙ্গে আলো-ছায়ার গল্প ভাগ করে নেওয়ার আনন্দের কাছে সাময়িক ক্লান্তি খুব বড় হয়ে ওঠেনি।
গত ২৯ ও ৩০ মে ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের ডিসি মেট্রো এলাকায় অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনব্যাপী ‘বাংলা সাহিত্য উৎসব’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কবি, ঔপন্যাসিক, গবেষক, শিল্পী, সাংবাদিক, প্রকাশক এবং সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় উৎসবটি পরিণত হয়েছিল এক বর্ণিল আন্তর্জাতিক মিলনমেলায়। ডিসি মেট্রো এলাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বসবাসরত বাংলাদেশি খ্রিস্টান কমিউনিটিসহ নানা পেশা ও পরিচয়ের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।
আলেকজান্দ্রিয়ার ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অডিটোরিয়ামে (২৮০০ Eisenhower Avenue, Alexandria, Virginia) আয়োজিত এই উৎসব শুরু থেকেই ছিল সুশৃঙ্খল, প্রাণবন্ত এবং অংশগ্রহণমূলক। প্রদীপ প্রজ্বলন, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন, ফিতা কেটে উদ্বোধন এবং অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। উৎসবের উদ্বোধন করেন সাদাত হোসাইন।

উদ্বোধনী আয়োজনের আবহে একটি বিষয় বিশেষভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে মৃদুস্বরে বেজে চলছিল কবিতা দিলওয়ারের কন্ঠে কবিতা এবং গানে কন্ঠে দিয়েছিলেন তরুণ জনপ্রিয় স্বপ্নীল সজীব সেই চিরচেনা গান—
“আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই,
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই…”
প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং বাংলার স্মৃতিমাখা এমন গান কানে ভেসে আসে, তখন দেশের প্রতি, ভাষার প্রতি এবং শেকড়ের প্রতি এক গভীর আবেগ কাজ করে। মনে হয়, হাজার মাইল দূরত্বও ভাষার টানকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
উৎসবের অনুষ্ঠানসূচি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার, লেখক-পাঠক মুখোমুখি, কবিতা আবৃত্তি, প্রকাশনা বিষয়ক মতবিনিময়, নৃত্য ও সংগীত—সবকিছু এমন সুন্দরভাবে বিন্যস্ত ছিল যে দর্শক বা শ্রোতাদের এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। বরং প্রতিটি পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে পরবর্তী আয়োজনের জন্য।
এত বড় একটি আয়োজনের পেছনে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাদের সবার নাম হয়তো এই মুহূর্তে স্মরণ করা সম্ভব নয়। তবে যাদের অবদান বিশেষভাবে মনে পড়ছে তারা হলেন—কবিতা দিলওয়ার, আনোয়ার ইকবাল কচি, তারেক মেহদী, দিনা ফেরদৌস সহ আরও অনেকে। তাদের আন্তরিকতা, শ্রম ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছাড়া এমন সফল আয়োজন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না।

উৎসবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহু গুণীজন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, কথাসাহিত্যিক আহমাদ মাযহার, সাংবাদিক ও লেখক আশরাফ কায়সার, আবু হানিফ, তারফিয়া ফয়জুল্লাহ, আনিস খান, সাদ্দাম আজলান সেলিম, একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী রোকেয়া সুলতানা, উত্তর আমেরিকা প্রথম আলো পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, এইচ বি রিতা, লেখক সামছুদ্দীন মাহমুদ, মাহমুদ মেনন খান, ড. আমীনুর রহমান, জিয়াউদ্দিন চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, লিপি দেওয়ান, গৌতম দত্ত, অনামিকা নেওয়াজ, মাহবুব লীলেন, সুমন শামসুদ্দিন, ক্লেমেন্ট গোমেজ, তানিয়া তোফা, রোকেয়া হায়দার, সরকার কবিরউদ্দিন, ইকবাল বাহার চৌধুরী, রেজা অনিরুদ্ধ, শিরিন বকুল, আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল, ড. আবদুন নূর, ইশতিয়াক রুপু, রওশন হক, ড. হাসান মাশরিকী, ফরহাদ হোসেন, মোস্তফা তানিম, রিয়াজুল মজুমদার, ড. মোহাম্মদ নকিবউদ্দিন, পিউস গোমেজ, তাহমিনা কবির, প্রজ্ঞা আহমেদ, কুলসুম আক্তার সুমি, গৌতম দত্ত, ইশতিয়াক রুপু, আনিস খান, প্রমুখ। তাদের বক্তব্য, অভিজ্ঞতা ও সাহিত্যচিন্তা উৎসবকে দিয়েছে গভীরতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঔজ্জ্বল্য।
প্রকাশনা জগতের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অংশ নেন বাতিঘরের জাফর আহমেদ রাশেদ, মুক্তধারার বিশ্বজিৎ সাহা, বিদ্যাপ্রকাশের মজিবর রহমান খোকা, অন্যপ্রকাশের অনামিকা নেওয়াজ এবং ইউপিএলের শামারুখ মহিউদ্দিন। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মধ্যে সরাসরি সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এই পর্বটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে’ শীর্ষক সেমিনার। লেখক, চলচ্চিত্রকার, শিল্পী এবং গল্পকারদের সৃষ্টিশীলতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. গোলাম রাব্বানী ও কাজী জামান। সঞ্চালনায় ছিলেন ড. খন্দকার মামুন। আলোচনায় উঠে আসে প্রযুক্তির পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, প্রকাশনার রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ সাহিত্যচর্চার নানা সম্ভাবনা।

এছাড়া ছিল লেখকদের আলোচনা, লেখক-পাঠক মুখোমুখি, ‘লেখকের প্রশ্ন—প্রকাশকের উত্তর’ পর্ব, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করে মুগ্ধ করেন মাহদিয়া জাহান ঈশাল। একাধারে গায়ক, নৃত্যশিল্পী ও অভিনয়শিল্পী হিসেবে তার পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে বিশেষ সাড়া জাগায়। ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী অদিতি মহসিন, শেখ মাওলা মিলন। মিউজিক কম্পোজিশন করেন তালহা রহমান। নৃত্য পরিচলক ও কোরিওগ্রাফার রোজমেরী মিতু।
উৎসব চলাকালে জানা যায়, Virginia Senate বাংলা সাহিত্য উৎসবকে সম্মান জানিয়ে Senate Resolution No. 164 প্রদান করেছে। এই স্বীকৃতি কেবল একটি উৎসবের অর্জন নয়; বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান। এটি বাংলা ভাষাভাষী কমিউনিটির দীর্ঘদিনের আন্তরিক প্রয়াস, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং সম্মিলিত সৃজনশীলতার স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
দুই দিনের এই সাহিত্য উৎসব শেষ হলেও তার আবেশ রয়ে যাবে আরও দীর্ঘ সময়। প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন শুধু আনন্দ দেয় না, নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারও পৌঁছে দেয়। প্রতিবছর এমন উৎসব হোক, আরও বিস্তৃত হোক বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক পরিসর, আরও দৃঢ় হোক প্রবাসে বাংলা ভাষার অবস্থান—এই প্রত্যাশাই রইল।

আহমদ সায়েম। কবি ও গদ্যকার


