প্রাণখুলে কোথাও যেতে চাইলে শরীর সবসময় সঙ্গ দেয় না। তবু মন যদি উড়তে চায়, তাকে আটকে রাখা যায় না। আবহাওয়ার প্রাণশক্তি সেদিন যেন পুরোপুরি বিপরীতমুখী ছিল—আকাশভরা বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস, ভেজা দুপুর; কিন্তু তবুও আমাদের থামাতে পারেনি কিছুই।
আলমগীর (বদরুজ্জামান) ভাই বললেন,—“সায়েম, রেডি হও। তোমাকে বইমেলায় যেতে হবে। আমাদের সঙ্গে শুধু বসে থাকবা, শরীরও ঠিক হয়ে যাবে।”
যো হুকুম।
রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে ছিলেন ‘ফিলাডেলফিয়া’ পত্রিকার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম আরিফ, কবি ড. কাউসারী মালেক রোজী এবং কবি ও নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীর। আমরা চারজন কাকভেজা হয়ে দুপুর একটা নাগাদ পৌঁছাই নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ২৩ মে ২০২৬ দ্বিতীয় দিনে।

বইমেলায় ঢুকেই প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ল, তা হলো নীরবতা। বৃষ্টিভেজা এই দুর্বিষহ আবহাওয়াকে সঙ্গে নিয়ে খুব বেশি ক্রেতা আসতে চাননি মেলায়। ফাঁকা ফাঁকা স্টল, ধীর পায়ের হাঁটাচলা, আর ভেজা কাপড়ে মানুষের শরীর—সব মিলিয়ে মেলার মাঠে যেন এক ধরনের বিষণ্ন সৌন্দর্য জমে ছিল।
তবে এই নীরবতারও এক ধরনের আশীর্বাদ আছে। ভিড় না থাকায় লেখকদের সঙ্গে পাঁচ-দশ মিনিট দাঁড়িয়ে গল্প করা গেছে, ছবি তোলা গেছে, কখনো সেলফিও। যে-মানুষদের আমরা সাধারণত মঞ্চে দেখি বা স্ক্রিনে বা বইয়ের প্রচ্ছদে দেখি, তাদের সঙ্গে সেদিন আড্ডা হয়েছে একেবারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
মাঠে ঢুকতেই প্রথম চোখ বিনিময় হয় ‘গল্পপাঠ’ পত্রিকার সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক কুলদা রায়ের সঙ্গে। ছিলেন গল্পকার দীপেন ভট্টাচার্য, অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন এবং ‘বাঙালি’ পত্রিকার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ। মেলার ভেতরে বিভিন্ন সময়ে তাদের আড্ডায় দাঁড়াতে হয়েছে। বসার তেমন কোনো সুব্যবস্থা ছিল না, ফলে কথার পর কথা এগিয়েছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই।

কাছের আরেক টেবিলে ছিলেন রুমা মোদক, পলি শাহীনা এবং রিমি রুম্মান। চা, নাস্তা, বই, লেখালেখি, প্রকাশনা—দৃষ্টিসীমার ভেতরে যা-কিছু ছিল, সবই যেন তর্কের উপাদান হয়ে উঠছিল। সেই আড্ডা ঘুরে গিয়ে থামল জলধি প্রকাশনীর প্রকাশক নাহিদা আশরাফীর কাছে। পরে যুক্ত হলেন বাতিঘরের প্রকাশনাব্যাবস্থাপক ও কবি জাফর আহমদ রাশেদ, বাতিঘরকর্ণধার দীপঙ্কর দাশ, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার, অভিনয়শিল্পী বন্যা মির্জা, কথাসাহিত্যিক বদরুন নাহার, অভীক সোবহান, লায়লা ফারজানা, সুমন শামসুদ্দীন, হুমায়ুন কবীর, রাজিয়া নাজমী, ইবরাহিম চৌধুরী খোকন, মনিজা রহমান, শামস আল মমীন, হুমায়ুন কবীর ঢালী, কুলসুম আক্তার সুমী এবং পারমিতা হিম সহ অনেক কবি ও লেখকের সঙ্গে।
হ্যাঁ, আরো অনেকে ছিলেন—যাদের মুখ মনে আছে, কিন্তু নাম এই মুহূর্তে স্মৃতি থেকে উঠে আসছে না।
লালন প্রাঙ্গণে আমার খুব একটা যাওয়া হয় না। বাইরের আড্ডাগুলোই বরাবর বেশি টানে। তবু পারমিতা হিমের সঞ্চালনায় ‘কলম ও কৌতূহল’ শিরোনামের একটি আয়োজন দেখতে ভেতরে গিয়ে কিছু সময় বসেছিলাম। অতিথি ছিলেন রাজু আলাউদ্দিন, দীপেন ভট্টাচার্য, আশরাফ কায়সার এবং সাদাত হোসাইন।
সেখানে আলোচনার একটি বিষয় আমার কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে—সৃজনশীল লেখালেখিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যাআইর প্রভাব।

সঞ্চালক পারমিতা হিমের প্রশ্ন ছিল,—“সৃজনশীল লেখাপত্রে অ্যাআই কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?”
দীপেন ভট্টাচার্য বললেন, যারা এখনো ব্যবহার করেননি, তারা হয়তো বুঝতেই পারছেন না এটি কী ভয়ঙ্করভাবে সহায়তা করতে পারে। একবার যদি কেউ অ্যাআইর কাছ থেকে এক-দুই লাইনও নিয়ে নেয়, তারপর তা থেকে দূরে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। নেশার মতো ধরে ফেলবে।
রাজু আলাউদ্দিন বিষয়টিকে দেখলেন অনুবাদের জায়গা থেকে। তিনি বললেন, অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়; এটি গভীরভাবে সৃজনশীল একটি কাজ। মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, ভাষার অন্তর্গত সুর—এসব কি যন্ত্র সত্যিই ধরতে পারবে? তিনি জেমস জয়েসের লেখার প্রসঙ্গ টেনে বললেন, কিছু অনুভূতি মানুষের পক্ষেই প্রকাশ করা সম্ভব, যন্ত্র দিয়ে তার গভীরতা স্পর্শ করা যায় না।

কিন্তু দীপেন ভট্টাচার্য সঙ্গে সঙ্গে বললেন,—“অ্যাআই সেই জায়গাটাও ছুঁয়ে ফেলেছে অলরেডি। এখনো যা দেখছি, সামনে আরও অনেক দূর যাবে।”
তারপর দীর্ঘ বিতর্ক। সাহিত্য, অনুভূতি, প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে কথাগুলো শুধু আলোচনা ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা। যারা সরাসরি উপস্থিত ছিলেন, আমার মনে হয় তারা সবাই গভীরভাবে উপভোগ করেছেন সেই কথোপকথন।
বাইরে বেরিয়েও আলোচনা থামেনি। আবার কুলদা রায় আর দীপেন ভট্টাচার্যকে একই টেবিলে পেয়ে অ্যাআই প্রসঙ্গেই নতুন করে তর্ক শুরু হলো। কোন কোন জায়গায় অ্যাআই ভয়ঙ্কর দক্ষ হয়ে উঠছে, সে-বিষয়ে দীপেন ভট্টাচার্য অনেক ইতিবাচক দিক তুলে ধরলেন। আমি খুব গভীরভাবে বিষয়টি বুঝি না, তাই চুপচাপ শুনছিলাম।
হঠাৎ কুলদা রায় একটি কবিতাকে অ্যাআই দিয়ে গান বানিয়ে শোনালেন। আমাদের খুব একটা ভালো লাগেনি। কিন্তু তারপর যা ঘটল, তা আমাকে সত্যিই বিস্মিত করল।
টেবিলে রাখা একটি বইয়ের এক পৃষ্ঠার ছবি তুলে তিনি অ্যাআইকে বললেন সেটি কম্পোজ করে দিতে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর প্রায় নির্ভুলভাবে পুরো লেখাটি টাইপ হয়ে গেল।

আমি থমকে গেলাম।
কারণ, এই একটি কাজই বহু মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়ে করে যেতে হয়।
তারপর তিনি আমার একটি ছবি তুলে অ্যাআই দিয়ে সেটিকে পেন্সিল স্কেচ, জলরঙের ছবি এবং ভাস্কর্যের আদলে তৈরি করে দেখালেন। সত্যি বলতে, দেখতে খুব ভালো লাগছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের অস্বস্তিও জন্ম নিচ্ছিল ভেতরে।
আমার পেইন্টার আর্টিস্ট বন্ধুদের কী হবে?
অ্যাআইয়ের এই ক্ষীপ্র দুনিয়ায় যারা দিনের পর দিন সময় নিয়ে একটি ছবি আঁকেন, একটি প্রচ্ছদ বানান, একটি মূর্তি গড়েন—তাদের ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে? আমরা যারা এখনো লেখার চেষ্টা করি, শব্দ নিয়ে বাঁচতে চাই, অনুভূতির কাছে ফিরে যেতে চাই—আমাদের অবস্থাই-বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী দিনে?
প্রযুক্তি মানুষকে সাহায্য করে—এ কথা সত্য। কিন্তু কোনো একসময় প্রযুক্তি মানুষকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে শুরু করলে, তখন কি আমরা কেবল বিস্মিত হবো, নাকি ভয়ও পাবো?
মেলা থেকে বের হওয়ার আগে দেখা হয় ড. ইবরুল চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন সাংবাদিক শামিমভাইয়ের সঙ্গে। এর আগে দেখা হয়েছিল প্রফেসর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ এবং ডা. ফাতেমা আহমেদের সঙ্গে।

বৃষ্টি তখনো থামেনি।
রাত গভীর করে ফিলাডেলফিয়ায় ফিরতে ফিরতে প্রায় দুইটা বেজে যায়। গাড়ির কাচ বেয়ে বৃষ্টির পানি নেমে আসছিল, আর আমার ভেতরে ঘুরছিল একই প্রশ্ন—
বইমেলার এই আড্ডাগুলো, মানুষের এই মুখোমুখি বসা, চায়ের কাপে জমে থাকা সাহিত্য, তর্ক, অনুভূতি—এসব কি কোনোদিন সত্যিই যন্ত্রের কাছে হার মানবে?
নাকি মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষকেই খুঁজে নেবে—সব প্রযুক্তির পরেও?
২৫ মে ২০২৬ / *অভিমত সম্পূর্ণতই লেখকের। সমস্ত আলোকচিত্র লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত।

আহমদ সায়েম । কবি ও গদ্যকার



