আমার একবার এনগেজমেন্ট হয়েছিল
মিউজিক সিটির এক হোটেলের ব্রেকফাস্ট রুমে বসে স্ক্র্যাম্বলড এগ আর প্যানকেক খাচ্ছিলাম। পাশের টেবিলে এক বৃদ্ধ লোক। সামনে তাঁর ওয়াটার ফ্লাস্ক, ফ্লাস্কের গায়ে নাতনির ছবি, আর তার নিচে লেখা, Grandpa.
একজন মাঝবয়সী, স্থূলকায়া নারী তাঁকে জিজ্ঞেস করছিলেন,
আপনি কি এয়ারফোর্সে ছিলেন?
তার পরিবারেরও কেউ একজন এয়ারফোর্সে ছিলেন। তাই দুজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ খুব সহজেই নিজেদের কিছু গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ লোকটি স্বভাবসুলভ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করলেন,
তোমার কি বিয়ে হয়েছে?
মহিলাটি বললেন,
আমার কখনও বিয়ে হয়নি, তবে একবার এনগেজমেন্ট হয়েছিল।
এই একটি বাক্যই আমার মনে অনেকক্ষণ ধরে বাজতে থাকল।
মনে হলো, এই ছোট্ট কথাটির ভেতরে হয়তো একটি দীর্ঘ জীবনের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে।
তারও একজন মানুষ ছিল।
অনামিকায় একটি আংটি ছিল।
বিয়ের প্রস্তুতি ছিল।
তারপর একদিন, কিছুই ছিল না।
হয়তো মানুষটি চলে গিয়েছিল।
হয়তো প্রতারণা করেছিল।
হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই সম্পর্কটি ভেঙে গিয়েছিল।
হয়তো সেই এনগেজমেন্ট তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
আবার হয়তো গভীর কষ্টেরও।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—
মানুষ আসলে কত কিছু নিজের মধ্যে নিয়ে একা একা বেঁচে থাকে!
হয়তো কোনো উৎসবের সন্ধ্যায় সেও অন্য সবার মতো চেয়েছিল, কেউ একজন তাঁর হাত ধরে বলুক,
“চলো, দুজনে মিলে নাচি।”
কেউ তার পাশে এসে বসুক।
কেউ তাঁর দিনের গল্প শুনুক।
কেউ ফুলছাপা একটা ফ্রক কিনে বলুক,
এই রঙটা তোমাকে ভারী মানায়।
সব মানুষের জীবনে কেউ একজন এসে পাশে বসে না।
কেউ কেউ শুধু একটি বাক্য বুকে নিয়ে বহু বছর একা হেঁটে যায়,
আমার কখনও বিয়ে হয়নি, তবে একবার এনগেজমেন্ট হয়েছিল।
সনা রুমের গল্প
জুম্বা ক্লাস শেষ হলে
আমরা প্রতি সন্ধ্যায় সনা রুমে বসি।
আমার বন্ধুদের মধ্যে
আমিই একমাত্র বিবাহিত।
কেউ সিঙ্গল,
কেউ রিলেশনশিপে আছে,
কেউ রিলেশনশিপ থেকে ফিরে এসেছে—
ওরা ওদের ডেটিংয়ের গল্প বলে,
অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি,
হঠাৎ পাওয়া ফুল,
অকারণ নীরবতা,
মধ্যরাতের বার্তা,
অথবা বার্তা না-আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প।
আমি সেখানে তারকা শ্রোতা।
কে কোথায় ভুল করেছে,
কে কী বলতে পারত,
কোন জায়গায় সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা যেত
সঙ্গে সঙ্গে ধরিয়ে দেই
এত মনোযোগ দিয়ে শুনি,
যেন পরীক্ষার আগের রাতে
মুখস্থ করছি নোটবই।
ওদের কাউকে আমার হিংসা হয় না।
কারণ, ততো দিনে বুঝে গেছি ওরাও আমার মতো কেউ সুখী না।
জীবনের জানালা দিয়ে যত পিছনে তাকাই
দেখি
আমি কোনোদিনই আসলে সুখী ছিলাম না।
কিশোরী বয়সে
আমি অপেক্ষা করতাম তরুণী হওয়ার জন্য।
তরুণী হয়ে
ফিরে যেতে চেয়েছি কিশোরীবেলায়।
যখন আমি দেখতে সুন্দর ছিলাম.
আমার একটা সুন্দর পোষাক কেনার সামর্থ্য ছিল না
যখন আমার সামর্থ্য হল
তখন আর আমি দেখতে সুন্দর নই
সনা রুমের তাপমাত্রা কমে আসে
আমার বন্ধুদের গল্প তবু চলতে থাকে
আমি শুনি।
আর মনে মনে ভাবি—
আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সুখী মানুষটি হয়তো আমিই,
যে অন্তত জেনেছে
সে কোনদিনই সুখী ছিল না!

মনিজা রহমান। কবি


