সেদিন গেছিলাম এক চড়ুইভাতিতে। একটি বড় পার্কে আমরা চড়ুইভাতি করলাম। আমার ২৬ বছরের এক বন্ধুর ছেলের বন্ধুরা এই চড়ুইভাতির আয়োজন করেছিল। যে যার মত খাবারদাবার এনেছিল। কেউ গীটার বাজাছে, ফুটবল খেলছে, কেউ বারবিকিউ করছে, কেউ নিছক আড্ডা মারছে। আবহাওয়া খুব অনুকূল থাকায় আমরাও খুব উপভোগ করছি। দেখলাম ছেলেটি একটা চেয়ারে বসে আছে আর তাকে ঘিরে স্কুল আর কলেজের সব বন্ধুরা আড্ডা মারছে, গান শোনাচ্ছে, হাসি মস্করা করছে, অতীত স্মৃতিকে উস্কে দিয়ে মজা করছে। বন্ধুবান্ধবরা সকলেই তার প্রিয় খাবার দাবার এনেছে। ছেলেটির শরীরে কোনও শক্তি নে্ই—ডাক্তার তাকে জানিয়ে দিয়েছে যে সে মৃত্যু পথযাত্রী। সে দু-চার ফোটা জল ছাড়া কিছুই খেতে পারে না। তবু মাঝে মাঝেই কোনও কান্নাকাটি ছাড়াই বলছে—আমি মৃত্যুর জন্য সত্যিই একেবারেই প্রস্তুত নই। হাতে আছে বড়জোর আর ৪-৫ দিন। মিথ্যা কিছু তো বলছে না—এতটুকু বয়েসে কে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে চায়? তারপরেও এই চড়ুইভাতিতে তাকে দেখে কেউ বলতে পারবে না তার ভেতরে কি উথালপাতাল চলছে। সেও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আড্ডায় মশগুল। ক’দিন আগেই সে ভাইদের সঙ্গে তার প্রিয় ফুটবল দলের ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল। কি অদ্ভুত কাণ্ড—এই চড়ুইভাতি শেষ হল—আর তার ঠিক পরদিন থেকেই তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে শুরু করল। সে যেন সকলের সঙ্গে বিদায় নিতে, জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে এই চড়ুইভাতির জন্যই অপেক্ষা করছিল। বাবা মা সকলের কাছে সে ক্ষমা চাইল। প্রবল যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য শেষের দিকে, তাকে তীব্র ডোজের মরফিন ইনজেকশন দেওয়া হতে থাকল।
শুনলাম, শেষের দিকে সে শুধু বাংলা শব্দে কথা বলত—ছোটবেলায় সে ভালোই বাংলা শিখেছিল। শিখেছিল পিয়ানো বাজানো, শিখেছিল রবীন্দ্রসংগীত। “আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা’—রবীন্দ্রসংগীতটি সে সুন্দর গাইত। ছোট্ট ৭ বছরের ছেলের এই প্রতিভা দেখে গর্ব বোধ করতাম, উচ্ছ্বসিত হতাম। কিন্তু তখন কি জানতাম যে ৩০ বছরের মাথায় এক ৩০ তারিখে সে নিজেই অন্য এক ভুবনে বিলীন হবে?! এখন ভাবলেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
ছেলেটি পরিবার ও বন্ধুদের কাছে নানান নামে পরিচিত ছিল। গত ৩০ তারিখে পরিবারের সান্নিধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল মাত্র ৩০ বছর বয়েসে। অন্যান্য প্রবাসী বাঙালীর মত মাত্র দুই বছর বয়সে পরিবারের সাথে ফিলাডেলফিয়ায় সে চলে আসে। শৈশবের বড় একটি অংশ কাটে এই ফিলাডেলফিয়াতেই—যতদিন না সে কলেজে ভর্তি হয়। ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই কৌতূহলী, সৃজনশীল ও দয়ালু স্বভাবের ছিল। সবসময়ই অন্যের উপকারের উপায় খুঁজত। আমি নিজেও দেখেছি সে আমেরিকাতে বড় হলেও, তার নিজ দেশের শিকড়ের খোঁজে কত না প্রশ্ন করত, আলোচনা করত, একটু বড় হলে একেবারে নিজেই ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে উড়ে গেছিল তার শিকড়ের খোঁজে। হাই স্কুলে পড়াশোনা করার সময়ে এখানকার একটি মেয়ের সাথে তাঁর পরিচয় হয়, ভাব জমে এবং পরবর্তীতে সেই মেয়েটি তার জীবনসঙ্গিনী হয়েছিল। মেয়েটি ছেলেটির এই মারণ রোগ হবার কথা জেনেও স্বত্বর পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয় এবং মৃত্যু পথযাত্রী এই ছেলেটিকে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিল তাকে বাঁচিয়ে তুলতে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছেলেটি পরে গবেষণার কাজে নিজুক হয়। স্বপ্ন ছিল একদিন সে চিকিৎসক হবে। সে-স্বপ্ন আর কোনোদিন পূর্ণ হল না। ভ্রমণ, সকার ও বাস্কেটবল খেলা, পোকেমন কার্ড সংগ্রহ করা এসবই তার নিজের হবি।
কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে গেলে সে এমনভাবে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন যে মনে হতো, সেই মুহূর্তে সমস্যাটি যেন তার নিজেরই সমস্যা। যেখানেই যেত সেখানেই নতুন বন্ধু তৈরি করত, কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধুদের কথাও কখনো ভুলে যেত না। সবসময়ে খুব গম্ভীর থাকলেও সে কৌতুক করার সুযোগ খুব একটা হাতছাড়া করত না। মানুষকে কীভাবে হাসাতে হয় তা সে জানত। আবার কোন জায়গায় কি কথা বলতে নেই তার সম্যক জ্ঞান তার ছিল। তার কাছে পরিবারই ছিল সবকিছু। বাবা-মা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের আত্মীয়-স্বজনের সাথে তার ছিল গভীর সম্পর্ক; আর সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারার বিষয়টি তাকে তাদের সাথে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতে সাহায্য করত। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সমস্যা সমাধানে সহায়তা করা এবং প্রয়োজনে পাশে থাকার মাধ্যমেই ছেলেটি তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাত।
এহেন একটি ছেলেটি ‘ডেস্মোপ্লাস্টিক স্মল রাউন্ড সেল টিউমার’ (DSRCT) নামক এক বিরল ও অত্যন্ত আগ্রাসী ক্যান্সারে আক্রান্ত হল। এটি বিরল ক্যান্সারগুলোর মধ্যে বিরলতম। সনাক্ত হবার দিনই সে জানল তার আয়ু খুব বড়জোর হলে ২-৪ বছর মাত্র। মাত্র ১৫% মানুষের আয়ু ৪ বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। এটা জানার পরেও সে তার রসিক, যত্নশীল, কৌতূহলী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জেদি মনোভাবসম্পন্ন একজন মানুষের প্রকৃত সত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। তাই আমার কাছে সে হিরো।
ওদিকে, এমন এক বিরলের মধ্যে বিরলতম ক্যান্সারের গবেষণার জন্য তেমন ফান্ডিং নেই। ফারমাসিউটিকাল কোনও কোম্পানি এর পেছনে টাকা করে ওষুধ তৈরি করে তো তারা লাভবান হবে না। যেসব রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেশী তার পেছনে আগ্রহ বেশী, অর্থবরাদ্দও বেশী। যদিও গবেষণা এই রোগটির ক্ষেত্রেও যে চলছে না তা নয় কিন্তু এর গতি ত্বরান্বিত করতে তো অর্থবরাদ্দ দরকার। আমরা যুদ্ধ করে মানুষ মারতে কত বিলিয়ন ডলার খরচা করতে দ্বিধা করি না। আমাদের কবে যে সুবুদ্ধি হবে আমি জানি না যাতে যুদ্ধের পেছনে এত টাকা না খরচা করে, গবেষণার পেছনে টাকা খরচ করা হয়। জানি না কখন আমরা সকল যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে একত্রিত হব, বিজ্ঞান শিক্ষার পেছনে একত্রিত হব। বিজ্ঞানের কথা বলছি – অপবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক প্রচারের পাল্লায় পড়ে নিজেকে গুলিয়ে ফেলবেন না। ফারমাসিউটিকাল শিল্পের চবুতরায় দীর্ঘদিন সময় কাটানোর সূত্রে মাঝে মাঝে আক্ষেপ হয় যে এখনও আমরা বিজ্ঞানীরা কত রোগ নিরাময়ের কিনারা করতে পারিনি। করতে পারলে হয়তো এমন এক অকালপ্রয়াণ রোধ করতে পারতাম। সমাজ সচেতনতাই একমাত্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে রাজনীতিবিদের বোঝাতে কেন বিজ্ঞান গবেষণার পেছনে অর্থবরাদ্দ বাড়ানো এত জরুরী এ ধরণের অকালপ্রয়াণ ঠেকাতে।
যাইহোক হৃদয় বিদারক এমন আসন্ন নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সকলে ছেলেটির শেষ সময়টুকু আনন্দে ভরিয়ে রাখতে যে চড়ুইভাতির আয়োজন করেছিল সেরকম কোনও চড়ুইভাতি আমি দেখিনি। আমার কাছে এক অনন্য চড়ুইভাতি। পরিশেষে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারে লেখা শ্যামল মিত্রের গাওয়া একটি গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করি। ছেলেটির কবরে মাটি দিতে দিতে এই গানটি-ই গুণগুণ করে গাইছিলাম। গানটির ছত্রটি হল—“তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা…/ কে বলে আজ তুমি নাই / তুমি আছ মন বলে তাই”।
ড. অতীশ চক্রবর্তী। ফিলাডেলফিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র



