ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি : মায়ের কোনো খোঁজ নেই। সময় যত গড়াচ্ছে, পরিবারের উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে। ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত বৃদ্ধা কখন, কীভাবে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছেন—কেউ জানেন না। পরিচিত জায়গাগুলোতে খোঁজ করেও মিলছিল না কোনো সন্ধান। শেষ পর্যন্ত একজন অপরিচিত মানুষের মানবিকতা এবং একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর দ্রুত উদ্যোগে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে গেলেন হারিয়ে যাওয়া সেই মা।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর ফিলাডেলফিয়ায়। বাংলাদেশি কমিউনিটির ওই প্রবীণ নারী ডিমেনসিয়ায় আক্রান্ত। হঠাৎ বাসার দরজা খুলে অজান্তেই বাইরে বেরিয়ে যান তিনি। পরে বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু হলেও প্রথমদিকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
এদিকে নিজের অজান্তেই সেন্টার সিটি থেকে একটি বাসে উঠে চেস্টার কাউন্টির দিকে চলে যান বৃদ্ধা। সেখানে এক আফ্রিকান-আমেরিকান ব্যক্তির নজরে পড়েন তিনি। কথাবার্তার একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, বৃদ্ধা একজন বাংলাদেশি এবং সম্ভবত পথ হারিয়েছেন।
মানবিকতার জায়গা থেকেই তিনি বিষয়টি নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সেন্টার সিটিতে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি তার দীর্ঘদিনের পরিচিত ও ক্রেতা। খবর পেয়েই ওই ব্যবসায়ী দ্রুত উদ্যোগ নেন। পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপে বৃদ্ধার ছবি ও সন্ধানের তথ্য ছড়িয়ে দেন।
একই সঙ্গে চেস্টারে থাকা ওই ব্যক্তিকে অনুরোধ করেন, বৃদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে সেন্টার সিটিতে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসতে। উদ্দেশ্য একটাই—কোনোভাবে পরিবারের কাছে মাকে ফিরিয়ে দেওয়া।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি গ্রুপে দেওয়া সেই বার্তা বৃদ্ধার ছেলের নজরে আসে। মায়ের সন্ধান পাওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত যোগাযোগ করেন, প্রয়োজনীয় তথ্য নিশ্চিত করেন এবং সেন্টার সিটিতে গিয়ে মাকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এখানে কোনো বড় সংগঠনের ব্যানার ছিল না, ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন। ছিল শুধু একজন অপরিচিত মানুষের সহমর্মিতা, একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর দায়িত্ববোধ এবং কমিউনিটির কয়েকজন মানুষের সহযোগিতা।
বৃহত্তর ফিলাডেলফিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নানা সময় সংগঠন, নেতৃত্ব কিংবা বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে মতবিরোধের খবর সামনে আসে। এসব ঘটনা কখনো কখনো সামাজিক বন্ধন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। কিন্তু এই ঘটনাটি তার বিপরীত একটি চিত্র তুলে ধরেছে—বিপদের সময় মানুষ এখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
মতের অমিল থাকতে পারে, নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, সামাজিক নানা বিষয়ে ভিন্নমতও থাকতে পারে। কিন্তু একজন অসহায় মানুষ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই একটি সমাজের মানবিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
এই বৃদ্ধাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাই শুধু একটি পরিবার স্বস্তি ফিরে পায়নি; বরং কমিউনিটির মানুষের মধ্যকার মানবিক সম্পর্কের একটি সুন্দর দৃষ্টান্তও তৈরি হয়েছে।
এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে খবরটি ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং বৃদ্ধাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও ছোট ভাই Ruhul Amin Prodan-কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
একটি ছোট্ট ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—সমাজে সমস্যা আছে, মতভেদ আছে; কিন্তু সমাজ এখনো নষ্ট হয়ে যায়নি। মানুষের ভেতরের মানবিকতাও এখনো বেঁচে আছে।



