বিনোদন রাজনীতি সাহিত্য

পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মীয় মতবাদ ও ধর্মগ্রন্থ

শেয়ার করুন:

পৃথিবীতে অতি প্রাচীন ধর্মীয় মতবাদগুলোর মধ্যে একটি হলো জরথুস্ত্রবাদ। বর্তমান কাল থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে পারস্য অঞ্চলে অর্থাৎ ইরানে এই ধর্মমতের জন্ম। এটি পৃথিবীর প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইরানিয়ান এই ধর্মের প্রবর্তক জরথুস্ত্র। এর ধর্মগ্রন্থের নাম জেন্দাবেস্তা যা আবেস্তা নামেও পরিচিত।

পনেরোশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ একহাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে ধর্মপ্রবক্তা জরথুস্ত্রের মুখনিঃসৃত কথাগুলো বংশপরম্পরায় আচার ও ঐতিহ্য মেনে গ্রন্থধৃত হয়েছে জেন্দাবেস্তায়। জেন্দাবেস্তা বা আবেস্তার মূল প্রার্থনা ও স্তবগান রচিত হয়েছে আবেস্তা ভাষায়। সাসানীয় সাম্রাজ্যের আগপর্যন্ত অর্থাৎ ২৪৪ খ্রি. থেকে ৬৫১ খ্রি. পর্যন্ত এই ভাষা মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়ে ছিল। সাসানীয় সাম্রাজ্যের সময় আরামাইট বা আরামীয় লিপির ওপর ভিত্তি করে আবেস্তা ভাষার জন্য তৈরি করা হয় নিজস্ব বর্ণমালা। বর্তমানে এটি একটি লুপ্তপ্রায় ভাষা।

জরথুস্ত্রীয় প্রথা অনুসারে সর্বজ্ঞানী দেবতা অহুর মাজদা জরাথুস্ত্রের কাছে দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করেছিলেন। জরথুস্ত্র তা পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সম্রাট বিশতাসপারকে। সেই শ্লোকসমূহ মোট একুশখানা গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা আছে, যা ‘নাস্ত’ নামে পরিচিত। জরথুস্ত্রবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত এবং বিকশিত হবার পর ধর্মসংক্রান্ত মূল রচনার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিনীতি, ভাষ্য, প্রথা প্রভৃতি ধারণার বিকাশ ঘটে। আবেস্তার মূল প্রতিপাদ্যগুলো লালিত হয়েছে আকেমেনিড সাম্রাজ্য ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের আমলে পারসিকদের আনুকূল্যে।

এর আগে প্রাচীন ইরানের প্রধান ধর্ম ছিল বহুঈশ্বরবাদী এবং সেই ধর্মে অহুর মাজদা ছিলেন দেবতাদের সম্রাট। এই দেবতারা জোটবদ্ধভাবে সত্যের পক্ষে লড়তেন, দাঁড়াতেন অশুভ শক্তি ‘আংগ্রা মন্যু’ ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। অহুর মাজদা ও তার দলের সেবক হিসেবে পূজাপ্রার্থনায় নিয়োজিত ছিলেন একদল পুরোহিত। ওই সময় খ্রি.পূ. ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে জরথুস্ত্র নামে এক পুরোহিত অহুর মাজদা থেকে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। অহুর মাজদা জরথুস্ত্রকে দেখা দেন এক নদীর তীরে। ঐশ্বরিক সেই সত্তা নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘বহু মানাহ’ অর্থাৎ ‘সৎ উদ্দেশ্য’ নামে। তিনি জরথুস্ত্রকে জানিয়েছিলেন, প্রকৃত ঈশ্বর একজনই এবং তিনি হলেন অহুর মাজদা। তার থেকে প্রাপ্ত দৈববাণীসমূহ মানুষের মধ্যে প্রচার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জরথুস্ত্রকে।

জরথুস্ত্রের সেই ধর্মীয় বাণী প্রচারের চেষ্টা শুরুর দিকটায় কেউ ভালো নজরে দেখেনি। একসময় জীবননাশের হুমকি পাওয়ায় তিনি নিজ গৃহ ত্যাগ করে হাজির হন সম্রাট বিশতাসপার দরবারে। প্রথমে সম্রাট নয়া ধর্মমতের জন্য তাকে বন্দি করলেও রাজার প্রিয় ঘোড়াটিকে সুস্থ করে দিলে জরথুস্ত্রের প্রতি সদয় হন তিনি। একসময় জরথুস্ত্রীয় মতে ধর্মান্তরিত হন সম্রাট। এরপর সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যজুড়ে শুরু হয় এই ধর্মের প্রচার ও প্রসার।

জেন্দাবেস্তার প্রাচীনতম অধ্যায়ের নাম ‘গাথা’। ধারণা করা হয়, অহুর মাজদার প্রশংসা সংবলিত এই স্তোত্রসমূহ রচিত হয়েছিল স্বয়ং জরথুস্ত্রের হাতে। এই অধ্যায়ে সুপথে জীবন পরিচালনায় রাস্তা দেখানোর জন্য অহুর মাজদার নিকট মিনতি করা হয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে, এই স্তবগানগুলো রচনা করা হয়েছিল সম্রাট বিশতাসপারের আদেশে। যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণভিত্তি নাই।

প্রাচীনকালে আবেস্তা রচনার স্বর্ণযুগ ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্য। সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম আর্দাশির (২২৪ খ্রি.-২৪০ খ্রি.) জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতদের রাজদরবারে তলব করে আবৃত্তি করিয়েছিলেন সেই স্তুতিগাথা, যাতে শ্লোকগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখা যায়। মৌখিক ধর্মজ্ঞান তখন রূপ নিয়েছিল লিখিতরূপে। প্রথম আর্দাশিরের পুত্র প্রথম শাপুর (২৪০ খ্রি.-২৭০ খ্রি.) এই কাজ সচল রাখেন। এরপর দ্বিতীয় শাপুর (৩০৯ খ্রি.-৩৭৯ খ্রি.), এবং প্রথম খসরুর (৫৩১ খ্রি.-৫৭৯ খ্রি.) শাসনামলে গিয়ে শেষ হয় লিপিবদ্ধকরণের বিশাল এই কাজ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *