চেনা মানুষ সকলেরই, সিনেমা আর্ট কালচার যারা কনজিউম করেন তাদের কাছে তো অবশ্যই, ব্রি লারসন। পুরো নাম ব্রায়ান সিডোনি ডেসলনিয়ার্স, সংক্ষেপে ব্রি লারসন, ১ অক্টোবর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে স্যাক্রামেন্টো, ক্যালিফোর্নিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় অভিনয়শিল্পী। ইংরেজি সিনেমায়, বিশেষত হলিউডি হাওয়ায়, অ্যাক্টিং দিয়ে একদশকের বেশি কাল ধরে এই শিল্পী হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন দর্শকদের। গুণী শিল্পীর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রুডিগার স্টার্ম, প্রকাশিত দ্য টক পত্রিকায়, মূল আলাপটি ইংরেজি ভাষায়, এইখানে তা হাজির হচ্ছে বাংলায়।
মিস লারসন, আপনার বেড়ে ওঠার সময়টায় ঠিক কোন ঘটনাটা আপনার কাছে তাৎপর্যবহ মনে হয়?
যে-শৃঙ্খল আমাদের বেঁধে রাখে এবং যে-বিষয়গুলি নিয়া আমরা জন্মাই, তা থেকে বেরিয়ে আসার এই প্রক্রিয়াটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং জীবনব্যাপী। আমরা আমাদের পরিবারের সাথে একটি সংযোগ নিয়ে জন্মাই, একটি নির্দিষ্ট উপায়ে বড় হই, একটি নির্দিষ্ট সমাজে বাস করি এবং পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট অংশে থাকি। এই সবকিছু থেকে বেরিয়ে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের কৌতূহলবোধের প্রয়োজন হয়। এখনও এমন মুহূর্ত আসে যখন আমি নিজেকে গুটিয়ে নিই, কিন্তু আমার ভেতরের স্বাধীনতার অনুভূতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি না থাকলে আমি আমার এই কর্মজীবনে এই পথে আসতে পারতাম না।

তার একটা কারণ কি এই যে, অভিনয় করতে গেলে নিজেকে অরক্ষিত করে তুলতে হয়?
হ্যাঁ, এবং এত মানুষের সামনে নিজেকে এতটা অরক্ষিত হতে দেওয়াটা এক বিরাট শান্তির অনুভূতি। মানুষ হওয়ার জন্য আপনি স্বাধীনতা, বোঝাপড়া এবং ক্ষমার অনুভূতি লাভ করেন। আপনি উপলব্ধি করেন যে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া কতটা কঠিন হতে পারে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার বা নিজের ইচ্ছামতো করে তোলার চেষ্টা না করে, যা ঘটছে তার প্রতি আরও বেশি খোলা মন রাখতে হবে, সেই মুহূর্তটা নিয়ে কৌতূহলী হতে হবে যখন আমরা অস্বস্তি বা হতাশা অনুভব করি। রামদেবের একটি চমৎকার উক্তি আছে, যেখানে তিনি বলেন, “আপনি যা অনুভব করছেন, সেটাই আপনার জীবন।”
একজন অভিনেতা হিসেবে আপনার সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন নেই?
এমনটা খুব কমই হয় যখন আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। অবশ্যই আমি আমার সংলাপ মুখস্থ করতে পারি, আমার চরিত্রকে খুব ভালোভাবে জানতে পারি, কিন্তু সারাদিন ধরে অনেক কিছুই ঘটতে থাকে। আবহাওয়ার সমস্যা থাকে, প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকে, দিনের বেলায় আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারে এবং অভিনেতার কাজটা বাকি সবার উপর নির্ভর করে — ফোকাস পুলার ঠিক আছে কিনা, আলো ঠিক আছে কিনা, ক্যামেরা চালু আছে কিনা, সবাই ভালো মনোভাব নিয়ে দ্রুত কাজ করছে কিনা। আমার এখনও সন্দেহ হয়, এখনও ভয় লাগে এবং মাঝে মাঝে এখনও মনে হয়, যদি আমি আমার বাবা-মায়ের সাথে বাড়িতে ফিরে যেতে পারতাম, আর তারা দুপুরের খাবার তৈরি করে দিত, আমি স্কুলে যেতাম আর জীবনটা আরও সহজ হয়ে যেত…

কিন্তু সেই বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া থেকে কত কিছুই না অর্জন করা যায়! অনুভূতিগুলো আরও অনেক গভীর হয়ে ওঠে। ছোটবেলার চেয়ে দুঃখ আর হারানোর অনুভূতি অনেক বেশি গভীর হয়, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভালোবাসা আর আনন্দের অনুভূতিতেও অনেক বেশি মাত্রা যোগ হয়… মানুষ হওয়ার এই দিকটাই সবচেয়ে কঠিন আর রোমাঞ্চকর। আমাদের প্রতিদিন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে এই জীবনকে বেছে নেওয়া এবং একে সার্থক করে তোলা এক অসাধারণ ব্যাপার। খুব কম জীবেরই এই সুযোগ থাকে। আমাদের সামনে অনেক সুযোগ ও বিকল্প রয়েছে — এটা এক বিরাট বোঝা, কিন্তু একই সাথে আমাদের জীবনের সবচেয়ে মুক্তিদায়ক অংশও বটে।
এই উপলব্ধিটা আসতে আসতে আপনার কতটা টাইম লেগেছিল?
আমি জানি না। আমার মনে হয়, আমি জন্ম থেকেই সবকিছুকে ভিন্নভাবে দেখতাম এবং প্রচলিত ব্যবস্থাকে মেনে নিতাম না। সৌভাগ্যবশত, আমার এমন একজন মা ছিলেন যিনি আমার ভিন্ন জীবন যাপনের ইচ্ছাকে খুব সমর্থন করতেন। তাই ১৫ বছর বয়সে স্নাতক শেষ করার পর আমি যা খুশি তা নিয়ে পড়াশোনা করতে পেরেছিলাম। আমি সাথে সাথেই দর্শন, পুরাণ এবং শিল্পকলার ইতিহাসে আরও গভীরভাবে ডুব দিতে শুরু করি এবং দ্রুতই বুঝতে পারলাম যে, এমন কিছু যোগসূত্র রয়েছে যা মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই অনুভব করে আসছে; এই রূপকগুলো, যেভাবে আমরা বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে জানি, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই উপরিভাগের নিচে আরও গভীর কিছু ঘটে চলেছে।

অভিনয় কি আপনাকে পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে?
বছর দুয়েক আগে আমি আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আরে, তুমি তো সারাজীবন শুধু তুমিই ছিলে।” আমাকে অনেক রকমের মানুষ হতে হয়েছে এবং পৃথিবীকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শিখতে হয়েছে। আমি অনেক ভিন্ন ভিন্ন মানুষ হিসেবে জীবন কাটানোর এক বিরল অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমি এমন অনেক আশ্চর্যজনক জিনিসের সংস্পর্শে আসি, যেগুলো সম্পর্কে আমি জানতামই না, যতক্ষণ না আমি পৃথিবীকে ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করি। উদাহরণস্বরূপ, ‘রুম’ সিনেমাটি আমাকে নিজের সম্পর্কে, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং মানবঅস্তিত্ব সম্পর্কে অনেককিছু শিখিয়েছে। সিনেমাটি তৈরি করা থেকে শুরু করে এটি মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত আমি অনেককিছু শিখেছি এবং আমার বেড়ে ওঠার পরিক্রমায় এর সাথে আমার সম্পর্কও বদলে গেছে। আমি দেখছি অন্যরাও তাদের নিজেদের বিভিন্ন দিকের সাথে পরিচিত হচ্ছে।
আপনার কী মনে হয়, এর কারণ কী হতে পারে?
কারণ সিনেমাটি আলোচনার জন্ম দেয় এবং এটি ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত। সিনেমাটি কী নিয়ে, সে-সম্পর্কে প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধারণা আছে। আর এটি এমন গভীর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার একটি নিরাপদ উপায়, যা নিয়ে কথা বলা সত্যিই কঠিন। যদি আপনি একটি ঘরে বন্দী থাকা কোনো নারীকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেন, তবে তা দেখা খুবই কষ্টকর এবং এর অর্থ হবে আপনি কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছেন। কিন্তু যদি আপনি এটিকে একটি শৈল্পিক চলচ্চিত্রে রূপ দেন, তবে তা একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সর্বজনীন অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়। আপনি কোনো কিছুর সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সেটিকে নিজের জীবনে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।

আপনার কাজ সর্বজনীন হোক, সবার কাছে গ্রাহ্য হোক, এটা কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
শিল্প যখন তার সেরা পর্যায়ে থাকে, তখন তা সর্বজনীন হয়। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি বারবার দেখা যায় এবং এর মর্ম উপলব্ধি করা যায়, আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর অর্থও আপনার কাছে ভিন্ন হয়ে ওঠে। এক অর্থে, এটি আপনার সাথেই বেড়ে ওঠে। আমি বড় হয়েছি নিজেকে অন্যদের থেকে অনেক আলাদা ভেবে এবং আমার এটা ভালো লাগত না। আমি যে নিজেকে আলাদা ভাবতাম, সেটা আমার পছন্দ ছিল না। স্কুলের অন্য বাচ্চাদের মতো না হওয়াটা অনুভব করা খুব কঠিন। আর এ নিয়ে আমি খুব একা ও বিষণ্ণ বোধ করতাম। অন্য মানুষের জীবনযাত্রা কেমন, সে সম্পর্কে আরও জানা আমার স্বপ্ন।
এবং সেই অভিজ্ঞতা অন্যদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া?
হ্যাঁ! বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং নিজের কথা বলার সাহস পাওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমার ভেতরে যা কিছু আছে, যে বিষয়গুলো নিয়ে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তা আসলে সবার মধ্যেই থাকে এবং তা প্রকাশ করার মাধ্যমে আমি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ মুক্তি অনুভব করি। আপনার মতো মানুষদের সাথে একাত্মতা অনুভব করে আপনি বলতে পারেন, “হ্যাঁ। তুমিও পাগল। আমারও এমনটা মনে হয়েছে।” এই পৃথিবীতে আমি যা খুঁজে বেড়াই তা হলো একাকিত্ব দূর করার অনুভূতি, এবং এটিই অন্য কাউকে দেওয়া যায় এমন শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি আশা করি আমার কাজ সেই কাজটিই করে। আমি আশা করি, প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরোনোর সময় দর্শকরা নিজেদের কম একা অনুভব করবেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ রুডিগার স্টার্ম (Rüdiger Sturm), চয়ন ও অনুবাদন প্রমিতা পার্ভিন



