এডিটর'স চয়েস রাজনীতি

বীর মুক্তিযোদ্ধা রওশন আরা রুশো : সংগ্রাম, ভালোবাসা, আশ্রয় ।। আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

রুশোআপা, বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, আপনজনদের কাছে এক আশ্চর্য ভরসার জায়গা। আমাদের ভালোবাসা, সংগ্রাম ও আশ্রয়ের প্রতীক।

ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যোদ্ধা রওশন আরা রুশো, আমাদের সবার প্রিয় রুশোআপা, বর্তমানে নিউমোনিয়াজনিত তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে ২৮ মার্চ ২০২৬ থেকে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি লাইফ সাপোর্টে আছেন, যা আমাদের সবার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

রুশোআপা শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান উপদেষ্টা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি।


একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি, ভালোবাসার ছোঁয়া
রুশোআপা আমার কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি আমাদের আপনজনের চেয়েও বেশি। প্রায় ২৫ বছর দেখাসাক্ষাৎ না থাকলেও, শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি খোঁজ নিতেন আমরা কেমন আছি। প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অসংখ্য অমলিন স্মৃতি।

কমিউনিটি হাসপাতালে কর্মরত সময়ে তিনি নিজে কখনো রোগী হিসেবে, আবার কখনো বিভিন্ন রোগী ও পার্টির কর্মীদের নিয়ে আসতেন চিকিৎসা কিংবা কাজের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। স্নেহভরা কণ্ঠে বলতেন, “আরিফ, তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করো।” সেই থেকেই তাঁর স্নেহ, আদর ও আন্তরিক ভালোবাসায় আমি সিক্ত হয়েছি।

তবে একটি আক্ষেপ আজও রয়ে গেছে। তাঁর একটি আশা আমি কখনো পূরণ করতে পারিনি। তিনি প্রায়ই হাসতে হাসতে বলতেন, “আরিফ, তোমাকেই একমাত্র পারিনি পার্টির কর্মী বানাতে! জীবনে এই একটি জায়গাতেই আমার অপূর্ণতা রয়ে গেল।” কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখে থাকত মায়া আর ভালোবাসার ঝিলিক।

আজ বলি, আপা, এর জন্য আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি তো জানতেন, আমি কখনোই সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ অনুভব করিনি।

১৯৯৮ সালে আমাদের বিয়ের সময়ও তিনি ছিলেন আমাদের ছায়াসঙ্গী। ঘটক হওয়া থেকে শুরু করে বিয়ের আয়োজন, হলরুম ভাড়া, এমনকি মেহমানদের তালিকা তৈরিও তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করে নিজের হাতে করেছেন। সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সেই অকৃত্রিম আন্তরিকতাই তাঁকে আমাদের জীবনে এক অনন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই ছিলেন আমাদের প্রিয় রুশোআপা; ভালোবাসা, স্নেহ আর দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।


সংগ্রাম, ভালোবাসা ও নৈর্ব্যক্তিক মাতৃত্ব
রুশোআপা আমাদের সবার কাছে নৈর্ব্যক্তিক মাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রায় চার দশকের পরিচয়ে তাঁকে যতটা কাছ থেকে দেখেছি, ততটাই উপলব্ধি করেছি, তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি অসংখ্য মানুষের আশ্রয়, সাহস ও ভালোবাসার নির্ভরতার নাম।

সংগঠনের ভেতরে কিংবা বাইরে কেউ অসুস্থ হলে, পারিবারিক সমস্যায় পড়লে বা যে-কোনো বিপদে পড়লে রুশোআপার স্নেহস্পর্শ পায়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিজের শারীরিক দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের অসুস্থতাকে উপেক্ষা করেই তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ওষুধ আর চিকিৎসা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী, তবুও তাঁর প্রাণশক্তি ছিল অফুরন্ত।

মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সহজাত, অকৃত্রিম এবং নিঃস্বার্থ।


বর্তমান অবস্থা ও আশার আলো
গত কয়েকদিন ধরে রুশোআপার শারীরিক অবনতিশীল পরিস্থিতি ঘিরে অগণিত বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের হৃদয়ে যে ব্যথা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশের অতীত। তবুও আশার কথা, আমাদের সবার ভালোবাসা ও প্রার্থনার জবাবে তিনি কিছুটা সাড়া দিয়েছেন, জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন।

চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনে কেউ যেন হাসপাতালে ভিড় না করেন। তাই সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ, দূর থেকেই দোয়া ও ভালোবাসা পৌঁছে দিন।


ফিরে এসো রুশোআপা
আমাদের অনেক কথা এখনো বলা বাকি। অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি, অনেক সংগ্রামের কথা। আপনার এই শূন্যতা পূরণ করার মতো কেউ এখনো আমাদের মাঝে নেই। আপনার অগণিত ভক্ত, সহযোদ্ধা আর শুভানুধ্যায়ীরা আজ একটাই প্রার্থনা করছে, আপনি ফিরে আসুন। বাংলাদেশের অতুলনীয় গরিমার কাল একাত্তরে গেরিলা ক্র্যাক প্লাটুন ওয়ারিয়র রওশন আরা রুশো সুস্থ শরীরে ফিরে আসবেন মানুষের মাঝে, সংগ্রামের মাঝে, ভালোবাসার মাঝে। এই প্রত্যাশায় তাঁর শুভানুধ্যায়ী নিকটজন সবাই দিন কাটাচ্ছেন উদ্বিগ্ন। সকলের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার ডাকে সাড়া দিন, ফিরে আসুন, রুশোআপা!


আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *