বাবা
অল্পতেই যে কত খুশি খোকার সোনা মুখ,
তারা জ্বলা চোখের ঝিলিক বাবার বুকের সুখ।
কচি মুখে নতুন কথা বাবার কাছে মিঠে,
বাবা সাজে তেজী ঘোড়া খোকা চড়ে পিঠে।
বাবার সাথে জমা গল্প, কতো রকম খেলা,
দোখতে দেখতে কখন এসে ফুরোল সেই বেলা।
সে সব ছবি মেঘের মতো হঠাৎ উড়ে আসে,
বোকার মত বসে বাবা একা একাই হাসে।
বায়োস্কোপ
মনটা ভীষণ কেড়েছিলো
বায়োস্কোপের খেলা,
জমেছিলো দারুন সেবার
বৈশাখের এক মেলা।
গাইছিলো গান সুরে সুরে
ঝুনঝুনি এক হাতে,
আতশ কাচে দেখা ছবির
বর্ণনা সেই সাথে।
তাজমহল আর কেল্লার ছবি
তারপরে কি আসে!
সোনারগায়ে ঈসা খানের
কামান তখন ভাসে।
যাদুর বাক্সে জগৎটাকে
দেখা হলো বেশ,
খঞ্জনি আর গানের তালে
হঠাৎ খেলা শেষ।
মায়ের চিঠি
আমরা ছিলাম অনেক গুলো ভাইবোন পিঠোপিঠি,
সংসার সামাল দিয়ে মা যে লিখতো আমায় চিঠি।
আসতো চিঠি মায়ের হাতের হলুদ রঙের খামে,
হাতের ছোঁয়ায় যত্ন করে লেখা আমার নামে।
পড়াশুনা হচ্ছে কেমন? শরীর কেমন আছে?
মা থাকতো যে বুকের ভেতর সাহস হয়ে কাছে।
ডিম দুধ কলা খেতে আমি যাই না যেন ভুলে,
চিঠি পড়ে যত্ন করে রেখে দিতাম তুলে।
মা যে দিতো চিঠির পাতায় আদর ছোঁয়া রেখে,
সেই পরশটা ধুলোর মতো নিতাম গায়ে মেখে।
মায়ের চিঠি আসবে না আর ডাক পিওনের হাতে,
থাকি চেয়ে দূর আকাশে তারা ফোঁটা রাতে।
ঘুড়ি
নদীর ধারে খোলা মাঠে পাগলা হাওয়া ছোটে,
দশ গেরামের ছেলেমেয়ে লাটাই হাতে জোটে।
দল বেঁধে সব বিকেল বেলা উড়ায় ঢাউস ঘুড়ি,
রঙচঙা খুব লম্বা লেজের মিলবে না তার জুড়ি।
ডোরাকাটা ফোঁটায় ভরা ঘুড়ির বুকটা জুড়ে,
টানলে সুতা ওড়ে ঘুড়ি নীল আকাশটা ফুঁড়ে।
হাওয়ার টানে মাতাল ঘুড়ি টানছে হাতের সুতো,
ষাঁড়ের মতো মারে সেতো মেঘের গায়ে গুঁতো।
পাল্লা দিয়ে ঘুড়ি ওড়ে কালো চিলের ডানায়,
সুখ যে তখন জলের মতো উপচে পড়ে কানায়।
মাঞ্জা দেয়া নতুন সুতোয় ঘুড়ি নিয়ে যুদ্ধ,
কী আনন্দ উৎসব যেনো জাগতো পাড়া শুদ্ধ!
উড়তে উড়তে যায় যে ঘুড়ি—দূরে তারা জাগে,
হাতের সুতা ছিঁড়লো কখন হয় নি খেয়াল আগে।
বাবার আসার সময় হলো
বাবার কথা সারাদিনে অনেক মনে পড়ে,
অফিস শেষে আবার কখন আসবে ফিরে ঘরে!
সূর্য ডোবে সন্ধ্যা নামে—দিগন্ত হয় কালো,
পাড়ার মোড়ে উঁচু খাম্বায় জ্বলে ওঠে আলো।
হারিকেনের আলোয় তখন জমতো পড়তে বসা,
হামলে পড়তো পায়ের উপর অত্যাচারী মশা।
মা তো তখন নামাজ সেরে ধূপটা দিতো জ্বেলে,
তবু যদি কামড় থেকে একটু রেহাই মেলে!
গুনগুনিয়ে পড়ার শব্দে উঠতো বাড়ি কেঁপে,
ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ ডাকের সুরটা যেতো ছেপে।
টুংটাং শব্দ আসে কানে—নীরব সারা পাড়া।
‘বাবা এলো’—এই কথাটা মনটাতে দেয় নাড়া
গেটের মুখে ঘন্টি বাজায়—রিক্সা এসে থামে,
বাজার হাতে বাবা তখন হাসি মুখে নামে।
নেমে আসে আকাশ থেকে তারার আলোর খেলা,
আজো তেমন গলির মুখে নামে সন্ধ্যা বেলা।
আইনস্টাইন
আইনস্টাইন যাচ্ছেন কোথাও লোকাল বাসে চড়ে,
একটা টাকা দিলেন ভাড়া নামবেন সামনের মোড়ে।
ফেরত পেলেন খুচরো পয়সা হাতে অনেক গুলো,
কি ভাবনা যে পেলো তাকে হলেন আপন ভুলো।
কতোবার যে বুঝায় তারে তার যে ছিলো তাড়া,
একটা টাকার বাকী তোমার—তিরিশ পয়সা ভাড়া।
ফ্যালফ্যালয়ে চেয়ে থাকে বড়ো বড়ো চোখটা,
একটা ভেঙে এতো গুলো—কী সব বলে লোকটা!
বললো তাকে, বোকা মানুষ যন্ত্রণা দেয় ভারি,
ভালো করে অঙ্ক শিখে চড়তে এসো গাড়ি।
গলা ধাক্কা কি দিয়েছিলো কে বলো তা জানে?
এ জগতের কোন কথাই যাচ্ছে না তার কানে।
একটা ভেঙে এতো পয়সা যাচ্ছে হাতটা ঘেমে,
ভাবতে ভাবতে বাসটা থেকে গেলেন তিনি নেমে।
ধানসিঁড়ি
বুকের ভেতর অনেক যত্নে কথা জমা আছে,
মেঘে ভেসে যাবো একা সেই নদীটার কাছে।
নদীর ওপর গাঙশালিকের মেলে দেয়া ডানা,
মেঠো গায়ের আনাচ-কানাচ সবকিছু যে জানা।
নদীর পাড়ে একটা বাড়ি আম বাগানের তলে,
জানলা দিয়ে যায় যে দেখা কুপির আলো জ্বলে।
বাড়ির ঘাটটা ছুঁয়ে নদী গেছে এঁকে বেঁকে,
বাঁশপাতাদের শব্দে মাতা স্মৃতি গেছে রেখে।
একটা নদী বয়ে যাওয়া স্বপ্নে খুঁজে ফিরি,
মধুর করে ডাকি তাকে নামটা তার ধানসিঁড়ি।

তূয়া নূর। কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের যশোর শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফার্মেসিতে এমএস। বর্তমানে ফ্লোরিডাতে ফার্মাসিস্ট হিসাবে কর্মরত।



