ফিলাডেলফিয়ার ওয়ালিংফোর্ড এলাকায় সুস্মিতা গুহ-রায়ের বাসভবনে এক অনাড়ম্বর স্মরণসভায় আমরা কয়েকজন পরিচিত মুখ একত্রিত হই। ঈদের সম্মিলনীর এক অবধারিত অংশ পরলোকগত ও ইহলোকেই স্পর্শের অতীত দূরে অবস্থিত পরিবার পরিজনদের স্মরণ ও স্মৃতিচারণ। ২০২৬ সালের রোজার ঈদ উদযাপন অনেক অর্থপূর্ণ ও অন্তরস্পর্শী হয়ে উঠল আমাদের প্রবাসদিনের স্বজন ও সদা সজ্জন আলী সিদ্দিকী ভাইয়ের প্রয়াত জীবনসঙ্গী দিলরুবা ভাবীর স্মরণে সভাগতদের সুভাষণে।
এই ঈদ-উত্তর আপনজন স্মরণসভায় দিলরুবা ভাবীর অনুপস্থিতি উল্লেখ করতে গিয়ে অবিভক্ত বাংলা ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিক, নাট্যকার ও কবি বদরুজ্জামান আলমগীর বলেন,—“ফুলগুলি যেন কথা, পাতাগুলি যেন চারিদিকে তার পুঞ্জিত নীরবতা”, এমনই নীরব সৌন্দর্যের এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি। জীবদ্দশায় তিনি যেমন সবসময় আপ্যায়নভরা আশ্রয় হতেন তাঁর আপনজনের, মৃত্যুর পরও তিনি স্মৃতির সুরভি বিলিয়ে এই বৃহত্তর সংসারেরই শ্রী বৃদ্ধির সমস্ত উদ্দীপনায় আমাদের সঙ্গেই চিরকাল থাকবেন।
আড্ডামুখর এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন রুমানা আলম, ফারুক সলিমুল্লাহ, নার্গিস পারভীন, সাহিদা আফরোজ নীপু, অভিষেক চৌধুরী, আবু আমিন রহমান, জলি দাস, স্বপন দাস, শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ দেবনাথ, শেলী রহমান, মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ, অতীশ চক্রবর্তী, আহমদ সায়েম, পার্থ দেবনাথ, ও জাফর বিল্লাহ । স্মৃতিচারণে সবার কণ্ঠই ছিল আবেগে ভারী। ঈদের স্নিগ্ধতা হাজির ছিল অনুষ্ঠানে, কেবল হুড়োহুড়ি চিলচিৎকারের জায়গায় ছিল অনন্তলোকের আবেগমূর্ছনা। কামরার আলোআঁধারি পরিবেশ যেন ওই অনুভূতিস্নিগ্ধ মূর্ছনাটা আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল।
মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ, যিনি বিজ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকেন সবসময়, এই অনুষ্ঠানে এসে ব্যক্তিগত অনুভবের জায়গা থেকে কথা বলেন। তিনি একটি ব্রেইন টিউমার অপারেশনের পর এক রোগীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, মানুষ কখনও কখনও মৃত্যুর প্রান্তে থেকেও আশপাশের সবকিছু অনুভব করতে পারে; জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা তখন খুব সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। যে-কোনো রক্তজ্ঞাতি কিংবা আত্মীয় বিয়োগের অভিজ্ঞতায় আমরা আরেক অর্থে অগাধ অনন্তলোকের কিছুটা আস্বাদ লাভ করি।
জাফর বিল্লাহ তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আলীভাইয়ের সঙ্গে এতটাই আন্তরিক সম্পর্ক যে, এই মৃত্যুবিচ্ছেদের ঘটনায় তাকে সান্ত্বনা জানাবার ভাষা আমার আসলেই জানা নাই। জগতে যা-কিছু অমোঘ, অপরিবর্তনীয়, তা ভাষায় বেশিদূর ভাবা যায় না। ভাবীর মৃত্যুর পর আলী সিদ্দিকী সৃষ্টিশীলভাবে এই অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এনেছেন এবং প্রতিনিয়তই নিজেকে সৃজনশীল করে রেখেছেন তার কবিতায়। জীবনের দীর্ঘদিনের দীর্ঘরাতের দোসর হারিয়ে এখন কবিতায় সেই দিনগুলি রাতগুলি যেন পুনর্নির্মাণ করে চলেছেন দোসরহারা আলী সিদ্দিকী।
নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জাফর বিল্লাহ একটি কবিতা পাঠ করেন বাংলায় এবং একটি ইংরেজি ভাষায়, আলী সিদ্দিকী বিরচিত কবিতা, এবং একটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানের অন্তিমে আলী সিদ্দিকী নিজের বক্তব্যে প্রয়াত পত্নীর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও উপস্থিত স্বজন সকলের কাছে এই মহিয়সী নারীর রুহের জন্য দোয়ার সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন।
কবি আলী সিদ্দিকীর সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর আবেগঘন বক্তব্যের মধ্য দিয়েই স্মরণসভা সমাপ্ত হয়।



