গল্প সাহিত্য

নৈকট্য, দূর ও সম্পর্কের সুর || রিমি রুম্মান

শেয়ার করুন:

২৬ বছর পর তুলির সঙ্গে আবার দেখা।

একসময় আমরা থাকতাম মুখোমুখি দুটি বাড়িতে। আমাদের ‘রব মন্জিল’ আর ওদের ‘আলমগীর হাউজ’। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে একটি পিচঢালা সড়ক। সারাক্ষণ রিকশা, গাড়ি আর ট্রাকের চলাচলে মুখর থাকত চারপাশ। সেই কোলাহলের মধ্যেই কেটেছে আমাদের শৈশব আর কৈশোর। একসঙ্গে হাসি, খেলা, মান-অভিমান, ছোটখাটো ঝগড়া, আবার মুহূর্তেই মিল, সব মিলিয়ে আপন ভাইবোনের মতোই বেড়ে উঠেছিলাম আমরা।

তখন কি জানতাম, জীবন একদিন আমাদের এত দূরে নিয়ে যাবে যে, বছরের পর বছর কেটে যাবে, অথচ দেখা হবে না? সময় নিঃশব্দে আমাদের পরিচিত উঠোন, প্রিয় পথ আর চেনা শহরটিকেও স্মৃতির অংশ করে দেবে?

ওরা ছিল পিঠেপিঠি তিন বোন। শেলী, তুলি, পলি। গত মাসে লন্ডন থেকে ম্যানচেস্টারে গিয়েছিলাম পলিকে দেখতে। আর আজ তুলি এসেছে সান ফ্রান্সিসকো থেকে আমার শহর নিউইয়র্কে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আমরা আছি ভিন্ন দেশে, ভিন্ন শহরে। তাই এখন যে শহরে জীবন গড়ে উঠেছে, সেটিকেই বলি ‘আমার শহর’। অথচ একসময় আমাদের সবার শহর ছিল একটাই- চাঁদপুর।

দূরত্ব কখনো সম্পর্ককে মুছে দিতে পারে না। আমরা যখনই একে অন্যের শহরে যাই, দেখা করার চেষ্টা করি। দীর্ঘ ২৬ বছর পর আবার মুখোমুখি হলাম আমরা। যেন সেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই বাড়ির মতো।

শেষবার দেখা হয়েছিল যখন, তখন সবে তারুণ্যের দুয়ারে পা রেখেছি। আজ আমরা মধ্যবয়সে। চুলে সময়ের রূপালি ছোঁয়া, জীবনের ঝুলিতে অগণিত অভিজ্ঞতা। বদলে গেছে ঠিকানা, জীবনযাপন, দায়িত্ব আর সময়ের হিসাব। তবু একে অন্যকে দেখার সেই মুহূর্তে মনে হলো, ২৬ বছরের দূরত্ব যেন এক নিমেষেই মিলিয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পিচঢালা রাস্তা, দুই বাড়ির বারান্দা, আর দুই বেনী করা দুটি কিশোরীর নির্ভার দিনগুলো।

সময় মানুষকে দূরে নিয়ে যায়। একসময় মুখোমুখি ছিল দুটি বাড়ি। ২৬ বছর পর বুঝলাম, বাড়িগুলো দূরে সরে গেছে, বদলে গেছে শহর আর দেশ। এমন কী জীবনও। কিন্তু কিছু মানুষ আজও ঠিক আগের মতোই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, হৃদয়ের খুব কাছে।

সম্পর্কগুলো যত্নে থাকুক। খুব যত্নে। ভালো থাকুন সকলে।


রিমি রুম্মান। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *